হঠাৎ কালকা মাগরিবের পাঁচ-সাত মিনিট পর আমার কাছে এক মানুষ দৌড়ে আসে কয়, “এরে মফতুল, তোর ব্যাটা নাকি ওটি মরে গেছে! আগুন লাগছে কারখানাত!” তখন তো আমি আর আমার মধ্যে নাই! তখন মনে হয়েছে দুনিয়ার থ্যাঁনে আমি চলে গেছি। বাবারে, তোরা দেখ তো বাবা! আমার ছাওয়ালের কি হলো? আমার ছাওয়ালটা কনে গেলো।’’ আহাজারি করে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবের রিয়াদে আগুনে পুড়ে মৃত রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল থেকে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী রুবেলের বাড়িতে শোকের মাতম বিরাজ করছে।
এর আগে রবিবার (৯ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে রুবেল নিহত হন। এ ছাড়া এই গ্রামের আরও তিনজন এই ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, ‘‘আমার তো আর দুনিয়ার বুকে কেউ থাকলো না বাবা। আমার নাতনি হছে কেবল ১৪ দিন হচ্ছে। দুনিয়ার বুকে তো আমাক আর দেখার মতো আর কিছু থাকলো না বাবা! ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে চলে গেল।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমার রুবেলের ৯ বছর হচ্ছে সৌদি যাওয়ার বয়স। সাড়ে ছয় বছর পরে ছুটিতে আইছিল। আসার পরে ছাওয়ালোক আবার বিয়া দিনু। বিয়া করে আবার গেলো সৌদি। যেয়ে দুই বছরকার মাথাত আবার আলো বাড়িত। আসে ছয় মাসের ছুটি কাটে গেলো। ছয় মাস ছুটি কাটায়ে যায়ে কেবল তিন মাস হলো। ওটি যায়ে সোফা সেটের কাজ করে হামার ছাওয়াল। আমি মানা করেছি, বাবা, ওই কাম তুই করিস না, ওই কাম কষ্টের কাম।’’
ছাওয়াল আমাক কয় “আব্বা, আমার এটি সুবিধা হয়। এটি আমার নিজের মানুষ সব আছে। কথাবার্তা বাংলায় কওয়া যায়। আর অন্যটি আরবির সঙ্গে আমার কথা কওয়ার অভ্যাস নাই। এটিই আমার ভালো, আব্বা।”
মোহাম্মাদ সাইদুর আরও বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, সরকারের কাছে কি চাবো? আমার ছাওয়ালটাক দয়া করে আমার সমানে যেন পৌঁছায়ে দেয়, এটাই আমার অনুরোধ। ওই সময় ৯ লাখ টাকা ধারদেনা করে দিয়ে ছাওয়ালেক পাঠাছুনু। কিছু পরিশোধ হছে, কিছু এখনো বাকিও আছে। জমি বেচে, ধারদেনা করে টাকা দিয়ে পাঠাছুনু।’’
প্রসঙ্গত, সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা এলাকার সোফা কারখানায় ১৬ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়িই নওগাঁর আত্রায় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।
আত্রাই উপজেলার নিহতরা হলেন, উপজেলার বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের মৃত বাদলের ছেলে সুমন (৩৫) ও একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ (২৭), কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের গাফফফার প্রামাণিকের ছেলে মহন প্রামানিক ও সুমন প্রামানিক, একই গ্রামের জান্নারের ছেলে রুবেল হোসেন (৩০) ও বজলুর প্রামাণিকের ছেলে কলিমউদ্দিন প্রামাণিক (৩৫), পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল জলিল (৩৮), বিশা গ্রামের আজহারের ছেলে সাগর (৩১) ও একই গ্রামের মজনুর ছেলে মজিদুল (৩৪), উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে ফরিদ শেখ (৩২),আত্রাই উপজেলার মিনহাজ, বোয়ালা গ্রামের হৃদয় এবং নওগাঁ গ্রামের শাহিন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









