স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের উত্তরসূরি হিসেবে ২০১৩ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছিলেন হোসে মরিনহো। তবে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে ফিরে যান পুরোনো ক্লাব চেলসিতে। দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবার নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পর্তুগিজ কোচ।
নেটফ্লিক্সে ১১ আগস্ট থেকে প্রচারিত তার ক্যারিয়ারভিত্তিক নতুন তথ্যচিত্রে মরিনহো বলেন, ‘রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার সময় আমি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যাওয়ার চুক্তি করেছিলাম, স্যার অ্যালেক্সের পর।’
ফার্গুসনও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ২৬ বছরে ইউনাইটেডকে ১৩টি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতানো এই কিংবদন্তি কোচ বলেন, ‘আমি তাকে বসিয়ে পুরো পরিস্থিতি বুঝিয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, সে দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব বদলে গেল।’
কারণটা ছিল চেলসি। লন্ডনের ক্লাবটির হয়ে ২০০৫ ও ২০০৬ সালে টানা দুটি প্রিমিয়ার লিগ জিতেছিলেন মরিনহো। আবার সেই ক্লাবের ডাক ফিরিয়ে দিতে পারেননি তিনি।
ফার্গুসনের ভাষায়, এক রাতে মরিনহো ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘অ্যালেক্স, আমি এটা করতে পারব না। আমি চেলসিকে কথা দিয়েছি, আর কথা ভাঙতে পারব না।’
মরিনহো বলেন, ইউনাইটেডের প্রস্তাব পেয়ে তিনি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করেছিলেন। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর তাঁর মনে হয়েছিল, যেখানে তাঁকে ভালোবাসা হবে, সেখানেই যাওয়া উচিত। ইউনাইটেডের দায়িত্ব না নেওয়াকে তিনি বড় সুযোগ হারানো হিসেবে দেখলেও সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই।
২০১৩ সালে চেলসিতে ফিরে তৃতীয়বারের মতো প্রিমিয়ার লিগ জেতেন মরিনহো। জেতেন লিগ কাপও। এরপর ২০১৬ সালে আবার ইউনাইটেডের দায়িত্ব নেন। আড়াই বছরের কিছু বেশি সময়ে দলটিকে লিগ কাপ ও ইউরোপা লিগ জেতান। তবে ফল খারাপ হতে থাকায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বরখাস্ত হন।
সম্প্রতি রিয়াল মাদ্রিদেও দ্বিতীয়বারের মতো ফিরেছেন মরিনহো। তার প্রথম মেয়াদ অবশ্য শেষ হয়েছিল তিক্ততায়। অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াসসহ দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়।
ক্যাসিয়াস বলেন, ‘জোসের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই শীতল হয়ে গিয়েছিল। একসময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যায়।’
সাবেক রিয়াল মিডফিল্ডার সামি খেদিরার মতে, ক্যাসিয়াসের সঙ্গে মরিনহোর দ্বন্দ্ব পুরো ড্রেসিংরুমকে অস্থির করে তুলেছিল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, সার্জিও রামোস ও স্পেনের অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গেও মরিনহোর সম্পর্ক নষ্ট হয়েছিল বলে জানান তিনি।
তবে মরিনহোর দাবি, ক্যাসিয়াসের মনোভাবই ছিল সমস্যার মূল। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের জন্য বেশি ছুটি, অনুশীলনের সময় পিছিয়ে দেওয়া এবং ম্যাচের আগে হোটেলে না থাকার মতো বিভিন্ন বিষয়ে ক্যাসিয়াসের অনুরোধে তিনি বিরক্ত হয়েছিলেন। তার ভাষায়, ‘তখন অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝেছিলাম, তারা অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে।’
বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের সঙ্গে স্পেন জাতীয় দলে ক্যাসিয়াসের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও মরিনহোর আপত্তি ছিল। তার বক্তব্য ছিল, জাতীয় দলে তারা সতীর্থ হতে পারে, কিন্তু ক্লাব ফুটবলে রিয়াল-বার্সেলোনার লড়াই আলাদা—‘এটা যুদ্ধ।’
আব্রামোভিচের সঙ্গে সম্পর্কও ছিল তিক্ত
চেলসির সাবেক মালিক রোমান আব্রামোভিচের সঙ্গেও মরিনহোর সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০০৭ ও ২০১৫ সালে দুই দফায় আব্রামোভিচই তাঁকে বরখাস্ত করেন।
প্রথম মেয়াদে আব্রামোভিচ দল গঠনে বেশি হস্তক্ষেপ করতেন বলে অভিযোগ মরিনহোর। বিশেষ করে ইউক্রেনীয় তারকা আন্দ্রেই শেভচেঙ্কোকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর আপত্তি ছিল। প্রায় ৩ কোটি পাউন্ডে চেলসিতে যোগ দেওয়া শেভচেঙ্কো তিন বছরে ৪৮ লিগ ম্যাচে মাত্র ৯ গোল করেছিলেন।
মরিনহো বলেন, ‘আমি শেভচেঙ্কোকে নিতে চাইনি। আমি কাউকে সেটা বলিনি—এ দায় আমারও।’
২০০৭ সালে বরখাস্ত হওয়ার পর প্রতিশোধের সুযোগ আসে ২০১০ সালে। চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলোয় ইন্টার মিলানের কোচ হিসেবে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে ফেরেন তিনি। ইন্টার সেদিন ১-০ গোলে জেতে এবং দুই লেগ মিলিয়ে ৩-১ ব্যবধানে চেলসিকে বিদায় করে।
মরিনহোর ভাষায়, ‘সত্যি বলতে, সেদিন আমি রোমানের বিরুদ্ধেই খেলছিলাম। যে আমাকে বরখাস্ত করেছিল, তাকে হারাতে চেয়েছিলাম। আমি আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম, আর সে ফিরেছিল হতাশ হয়ে।’
তবে মরিনহোর কাছে বিষয়টি শুধু প্রতিশোধের ছিল না। তার বিশ্বাস, ফুটবল শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়, কোচ ও সমর্থকদেরই। আর সেই ফুটবলেই নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর সবচেয়ে বড় লড়াই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









