তীব্র লোডশেডিংয়ে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন মানুষ। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় দুর্ভোগের পাশাপাশি গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। সিলেট মহানগরের অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৮ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। গ্রামের পরিস্থিতি আরও নাজুক। কোথাও একটানা তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, আবার অনেক এলাকায় দিনের অর্ধেক সময়ও বিদ্যুৎ মিলছে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিদ্যুৎ না থাকায় নগরের বাসাবাড়িতে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসাসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা। তীব্র গরমের কারণে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ায় লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তথ্য অনুসারে, জাতীয় গ্রিড থেকে অপর্যাপ্ত সরবরাহ, জ্বালানি সংকট এবং স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে সিলেটে বিদ্যুৎঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট অঞ্চলে প্রতিদিন বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৪৭৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সিলেট মহানগর ও আশপাশের শহরাঞ্চলে পিডিবির আওতায় চাহিদা ১৭০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট। আর জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় চাহিদা প্রায় ৩০৭ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে বর্তমানে সিলেটে ১৪০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। ফলে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকছে ৩০০ মেগাওয়াটেরও বেশি।
তবে পিডিবির আওতাধীন সিলেট অঞ্চলের দৈনিক হিসাব কিছুটা ভিন্ন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) চাহিদা ছিল ২৬৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ২১৭ মেগাওয়াট, ঘাটতি ৫০ মেগাওয়াট। সোমবার চাহিদা ছিল ২৪৭ মেগাওয়াট, সরবরাহ পাওয়া গেছে ২০২ মেগাওয়াট, ঘাটতি ৪৫ মেগাওয়াট। রবিবার চাহিদা ছিল ২৩৩ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৭৭ মেগাওয়াট, ঘাটতি ছিল ৫৬ মেগাওয়াট।
সিলেট নগরের আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়া বলেন, দিনে-রাতে অন্তত সাত থেকে আটবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করে। রাত ১২টার পরও বিদ্যুৎ চলে যায়।
গৃহিণী ফরিদা রহমান বলেন, একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং। পানির ট্যাংকি ভরতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোটর চালাতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি।
ব্যবসায় বাড়ছে খরচ
লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অনলাইনে কাজ করা ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীরাও সমস্যায় পড়ছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমনিতেই ব্যবসায় মন্দা। তার ওপর কিছুক্ষণ পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির জেলা শাখার মহাসচিব আব্দুর রহমান রিপন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে দিন-রাত সমানতালে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণত বিকেল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ব্যবসার পিক আওয়ার। কিন্তু এই সময়েই লোডশেডিং বেশি হচ্ছে।
সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ
গতকাল সোমবার রাতে সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে জাউয়া বাজার এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদ করছেন স্থানীয়রা বাসিন্দারা। এর আগে রবিবার রাতেও সিলেট সদর উপজেলার টুকেরবাজার, খাদিমনগর, বলাউরাসহ কয়েকটি এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, প্রতি ঘণ্টার ব্যবধানে একাধিকবার লোডশেডিং করা হচ্ছে। আবার দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বিদ্যুৎ মিলছে না। শুধু নগর নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কোথাও কোথাও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেন গ্রাহকেরা।
তবে মঙ্গলবার সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে বলে জানালেন সিলেট পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন। দুপুরে তিনি এদিনকে বলেন, দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সিলেটের বন্ধ স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রকৌশলগত মেরামত দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









