যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অ্যামাজনের একটি বিশাল ডেটা সেন্টার প্রকল্পের জন্য নির্মাণাধীন প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে দেশটির সবচেয়ে বড় একক কার্বন দূষণকারী স্থাপনায় পরিণত হতে পারে। এমনকি এর কার্বন নিঃসরণ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি নির্গমনকারী বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
টেক্সাসের পেকোস কাউন্টিতে অ্যামাজন একটি বড় ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এই ধরনের ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে। প্রকল্পটির জন্য অ্যামাজন সেখানে একটি নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বছরে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৩০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করার অনুমতি পেয়েছে। প্রকল্পটি পরিকল্পনা অনুযায়ী তৈরি হলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একক স্থাপনা থেকে সবচেয়ে বেশি জলবায়ু দূষণ ঘটানোর রেকর্ড তৈরি করতে পারে।
তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী হিসেবে পরিচিত আলাবামার জেমস এইচ. মিলার জুনিয়র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে। অর্থাৎ অ্যামাজনের প্রস্তাবিত কেন্দ্রটির অনুমোদিত নিঃসরণ তার দ্বিগুণেরও বেশি।
তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সব সময় তাদের অনুমোদিত সর্বোচ্চ সীমায় দূষণ করে না। পেকোস কাউন্টির প্রকল্পটিও এখনো নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে বাস্তবে এর নিঃসরণ কত হবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
অ্যামাজন অবশ্য বলছে, এই প্রকল্পের কারণে টেক্সাসের সাধারণ গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়বে না। কোম্পানির দাবি, নতুন ডেটা সেন্টারটি শুরুতে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে চলবে এবং ভবিষ্যতে গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হবে।
অ্যামাজন জানিয়েছে, তারা ওই এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। প্রকল্পটি হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে বলেও কোম্পানির দাবি।

এটি ডেটা সেন্টারের জন্য অ্যামাজনের প্রথম বড় অফ-গ্রিড বিদ্যুৎ প্রকল্প বলে জানা গেছে। তবে এ পথে তারা একা নয়। মাইক্রোসফট, গুগল ও মেটার মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানিও এআইয়ের বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করছে।
এতে অ্যামাজনের জলবায়ু প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৯ সালে কোম্পানিটি ২০৪০ সালের মধ্যে নিট-শূন্য কার্বন নিঃসরণে পৌঁছানোর অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু এরপরও তাদের মোট নিঃসরণ কমার বদলে অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে।
অ্যামাজন অবশ্য বলছে, তারা এখনো জলবায়ু প্রতিশ্রুতির প্রতি অটল। কোম্পানিটি টেক্সাসে ৪০টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সহায়তার কথাও তুলে ধরেছে। তাদের ভাষ্য, আরও টেকসই হওয়ার পথ সব সময় সরল নয়।
ডেটা সেন্টার নিয়ে শুধু পরিবেশগত উদ্বেগই নয়, রাজনৈতিক বিতর্কও বাড়ছে। এসব স্থাপনা বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের দামের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
টেক্সাসে পরিস্থিতি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে রাজ্য সরকার নতুন ডেটা সেন্টার প্রকল্প অনুমোদনে সাময়িক বিরতি দিয়েছে। প্রস্তাবিত প্রতিটি প্রকল্পের বিদ্যুৎ চাহিদা খতিয়ে দেখার জন্য নিয়ন্ত্রকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট বলেছেন, রাজ্যের মানুষের স্বার্থই সবার আগে।
রাজ্যের তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসের বিদ্যুৎ গ্রিডে নতুন বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আসছে ডেটা সেন্টার থেকে। এসব প্রকল্পের মোট চাহিদা ৪৭৪ গিগাওয়াট—রাজ্যের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহারের রেকর্ডের পাঁচ গুণেরও বেশি।
এআইয়ের বিস্তার যত দ্রুত হচ্ছে, ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদাও তত বাড়ছে। গ্রিড সম্প্রসারণে দেরি এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির সীমাবদ্ধতার কারণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাই নিজস্ব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পেও বিনিয়োগ করছে।
প্রযুক্তির এই দৌড় এখন নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে—এআইয়ের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে পরিবেশের মূল্য কতটা দিতে হবে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









