প্রতিদিন দুপুর গড়ালেই শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পালেরচরে পদ্মার পাড় মুখরিত হয়ে ওঠে ক্রেতা-বিক্রেতার হাকডাকে। প্রমত্তা পদ্মা থেকে জেলেদের আহরিত তাজা রুপালি ইলিশ, নদীর বড় বড় পাঙ্গাশ, বেলে মাছ ও আইড় মাছের সুবাসে জমজমাট হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী পালেরচরের এই মাছের বাজার।
উপজেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে হাটের ইজারাদার ‘রানা সরদার’ পরিচালনা করেন এই পালেরচর হাট ও মাছের বাজার। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার মাছ বেচাকেনা হয় এ বাজারে।

পদ্মা নদী থেকে জেলেরা নদীর তাজা মাছ ধরে সরাসরি নিয়ে আসেন এই হাটের ৪টি প্রধান আড়তে। এরপর শুরু হয় ডাক বা নিলাম প্রক্রিয়া। পাইকাররা নিলামে মাছ কিনে নিজস্ব পরিবহনে নিয়ে যান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আর স্থানীয় পাইকারগন মাছ কিনে ডালা সাজিয়ে বসেন আড়তের পাশেই।
হাটে রয়েছে সাধারণ ক্রেতাদের সরাসরি ডাক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় ও বহিরাগত পাইকারদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ক্রেতারা দরদামে সুবিধা করতে পারেন না। ফলে অনেক সময় আড়ত থেকে সরাসরি কিনতে গেলেও চড়া দাম গুণতে হয় সাধারণ ভোক্তাদের। পরবর্তীতে এই মাছগুলো আড়তের পাশেই খুচরা বাজারে ১০০ থেকে ২০০ টাকা লাভে বিক্রি করেন পাইকাররা।
সপ্তাহের ৭ দিনই দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। হাটে সবথেকে বেশি বিক্রি হয় বিশ্বখ্যাত পদ্মার ইলিশ। এছাড়া রূপালী ইলিশের পাশাপাশি বেলে, নদীর পাঙ্গাশ, গলদা ও হরিণা চিংড়ি, আইড় এবং পদ্মার বোয়াল মাছের বিশাল সমাহার ঘটে এই হাটে।
রাজধানী ঢাকা থেকে দূরত্ব কমে যাওয়ায় শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজারটির চেহারা বদলে যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ী জাকির হোসেন জানান, “শুক্র ও শনিবারে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে শুধু এই দুই দিনেই বেচা-কেনা ৫০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।” জুম্মার নামাজের পর থেকে আর শনিবার দুপুর ১২ টার দিকেই জমে ওঠে বাজার।
ঢাকা থেকে আসা পাইকার সুজন আকন জানান, পালেরচরের তাজা ইলিশ ও চিংড়ির চাহিদা ঢাকার আরত গুলোতে বেশ ভালো। বাজারটি ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় মাছ দ্রুত পৌঁছে দেওয়া যায় এবং তাজা থাকায় ভালো দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। তাই আর আগের মতো লাভ থাকে না।"
নদীর প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও জেলেদের জালে ধরা পড়ছে কাঙ্ক্ষিত রূপালী ইলিশ। স্থানীয় জেলে শুকুর মাঝি জানান, “কয়েকদিন ধরে বেশ ভালো ইলিশ পাচ্ছি, তাই বেশ স্বস্তিতে আছি। সামনেই ইলিশের প্রজনন মৌসুমের সরকারি নিষেধাজ্ঞা (২২ দিনের মা-ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান) আসবে। তাই এই সময়টায় মাছ বেশি পাওয়াটা আমাদের জন্য আনন্দের।”
শুধু মাছ কেনাবেচাতেই সীমাবদ্ধ নয় পালেরচরের এই হাট; এই হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বহুমুখী গ্রামীণ অর্থনীতি। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা ও পাইকারদের ওপর ভিত্তি করে হাটে গড়ে উঠেছে ভাতের হোটেল, চা-নাস্তার দোকান। অনেকে ঝালমুড়ি, ডাব কিংবা ভাতের হোটেল দিয়ে হয়েছেন সাবলম্বী।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









