ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) মেরামতের কাজ শেষ হলে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট শিগগিরই কমে আসবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীতে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার এবং টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইকবাল হাসান মাহমুদ এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন। মন্ত্রী জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণেই চলমান সংকট শুরু হয়েছিল। যদিও বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে সরাসরি কিছু করার সুযোগ সীমাবদ্ধ। কারণ, নতুন করে হঠাৎ গ্যাস উত্তোলন করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এফএসআরইউ সচল না থাকা পর্যন্ত বিদ্যমান গ্যাস খালাস করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়াও সম্ভব নয়।
এ ছাড়া বর্তমান ব্যবস্থাপনা কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, বিদেশি প্রকৌশলীরা যতক্ষণ পর্যন্ত এফএসআরইউ মেরামত শেষ না করছেন, ততক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো গতি নেই।
মন্ত্রী বলেন, ‘‘এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে এফএসআরইউতে, এটা করা ছাড়া আমার কিছু নাই। আর কিছু ম্যানেজমেন্ট করা, যাতে কম লোডশেডিং হয়। যাতে আমি ইন্ডাস্ট্রিকে গ্যাসটা দিতে পারি, এই ম্যানেজমেন্টটা করা। এ ছাড়া আপনিই বলেন আমার হাতে আর কী থাকতে পারে।’’
মন্ত্রী বলেন, এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। তবে মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। কারিগরি সমন্বয়ের জন্য তখন পুরো সিস্টেমটি টানা ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন বন্ধ রাখা লাগবে বলেও সতর্ক করেন মন্ত্রী। মন্ত্রী বলেন, যার প্রভাবে সাময়িকভাবে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেবে।
তবে সরকার ইতোমধ্যে এলএনজি কার্গো সংগ্রহ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এফএসআরইউ পুনরায় চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এসব কার্গো খালাস করা হবে। এর ফলে বর্তমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমানে মধ্যরাতের পরও বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা অব্যাহত থাকে। সম্প্রতি এই চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়ার কারণে রাতের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব চার্জিং কেন্দ্রের অনেকগুলো অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করছে। সরকার এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে জনসাধারণের প্রতিরোধ এমনকি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, এলএনজি সরবরাহ জোরদার এবং বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত করতে ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে তিনটি নতুন এফএসআরইউ স্থাপন করা হবে। বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান পাইপলাইন নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে চট্টগ্রাম থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে একটি গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারের লক্ষ্যে সরকার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ উদ্দেশ্যে দু’টি নতুন ড্রিলিং রিগ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিল্প খাতকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভোলা থেকে সরাসরি শিল্পকারখানায় গ্যাস পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এছাড়া নতুন পাইপলাইন নির্মাণের অপেক্ষা ছাড়াই শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহের জন্য কনটেইনারভিত্তিক গ্যাস পরিবহন ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জ্বালানি খাতের সংস্কারের বিষয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে সরকার বিদ্যমান 'সিঙ্গেল বায়ার সিস্টেম' থেকে সরে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে বেসরকারি খাতকে তেল আমদানি ও বিতরণের সুযোগ দিতে নতুন জ্বালানি তেল নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রণীত সৌর জ্বালানি নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে উৎসাহ দিতে সরকার কর অবকাশ সুবিধা দিয়েছে এবং ব্যাটারি ও ইনভার্টারের ওপর শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে। এ সংকট উত্তরণে তিনি বিনিয়োগকারী ও গণমাধ্যমের নৈতিক সমর্থন কামনা করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









