সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ স্বরূপচন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সরকারি মেরামত ও সংস্কারকাজে ব্যাপক অনিয়ম, গাফিলতি ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। শিডিউল অনুযায়ী কাজ না করে ইচ্ছেমতো নির্মাণকাজ করার অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সংস্কারকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এ সময় বিক্ষুব্ধ স্থানীয়দের তোপের মুখে সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী প্রকৌশলী ভানু দাস ও ঠিকাদার নজরুল ইসলাম দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, সুনামগঞ্জের অধীনে ‘সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মেরামত ও সংস্কার’ প্রকল্পের আওতায় ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ই-জিপি প্রক্রিয়ায় কাজটি পায় ‘মেসার্স স্মার্ট এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রায় ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয় ভবনের ফ্লোরে পেটেন্ট স্টোন, আরসিসি ঢালাই, রং করা, বারান্দায় গ্রিল স্থাপনসহ বিভিন্ন সংস্কারকাজ করার কথা রয়েছে।
তবে বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে ভেতরের প্রায় ১০ ফুট চওড়া রাস্তায় শিডিউল অনুযায়ী ৫ ইঞ্চি পুরু আরসিসি ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে রড ব্যবহার না করে মাত্র ২ থেকে আড়াই ইঞ্চি পুরু ঢালাই দেওয়ার কাজ চলছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঢালাইয়ের কাজে নিম্নমানের ও জমাটবদ্ধ নষ্ট সিমেন্ট, অতিরিক্ত বালু এবং পর্যাপ্ত কংক্রিট ছাড়া নামমাত্র উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়রা প্রতিবাদ জানালেও শুরুতে সংশ্লিষ্টরা তা আমলে নেননি। পরে উত্তেজিত জনতার চাপের মুখে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা, মুহিবুর রহমান, ফারুক মিয়া ও মঈন উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চালানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর যোগসাজশে এমন অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা অনিয়ম হওয়া অংশ সম্পূর্ণ ভেঙে শিডিউল অনুযায়ী নতুন করে কাজ করার দাবি জানান।
একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জগন্নাথপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হাসান সুনু বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি মেনে নেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে শিডিউল অনুযায়ী টেকসই ও গুণগত মানসম্পন্ন কাজ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সাংবাদিক ও সচেতন সমাজকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সৈয়দ নুর অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, মঙ্গলবার সকালে তিনি বিদ্যালয়ে আসার আগেই ঢালাইয়ের কাজ শুরু করা হয়। বিদ্যালয়ে এসে তিনি দেখতে পান, নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী ৫ ইঞ্চি উচ্চতার ঢালাই দেওয়া হচ্ছে না এবং কাজের মানও সন্তোষজনক নয়। এমনকি বস্তায় জমাটবদ্ধ নষ্ট সিমেন্টও ব্যবহার করা হচ্ছিল।
তিনি জানান, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হলে তাদের নির্দেশে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনিয়ম হওয়া অংশ সম্পূর্ণ ভেঙে শিডিউল অনুযায়ী ৫ ইঞ্চি পুরু ঢালাই ও প্রয়োজনীয় মান নিশ্চিত না করা পর্যন্ত পুনরায় কাজ শুরু করতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ শিক্ষা ও প্রকৌশল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী সৈয়দ তারেক জহিরুল হক বলেন, শিডিউল অনুযায়ী অবশ্যই ৫ ইঞ্চি পুরু ঢালাই দিতে হবে। কাজের অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি থাকবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









