শরীয়তপুরের জাজিরায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারের পর প্রতিপক্ষের অর্ধশতাধিক বাড়িঘরে বোমা বিস্ফোরণ, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাড়িঘর থেকে গবাদিপশু, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবির অভিযোগও রয়েছে।
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করলেও হামলা ও লুটপাট ঠেকাতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, সংঘর্ষের পর প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা থাকলেও যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যদিও পুলিশ বলছে, হামলা ও লুটপাটের লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জাজিরা উপজেলার মুলনা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল শিকদার ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তমিজ খাঁর সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। এরই জেরে সোমবার সন্ধ্যায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে শতাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। এক ব্যক্তির হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে ককটেল বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান ৭০ বছর বয়সী মান্নান সরদার।
মান্নান সরদারের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ছেলে দিদার সরদার বাদী হয়ে বুধবার জাজিরা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। পুলিশ এ মামলার এজাহারভুক্ত আট আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
তবে মামলা দায়ের ও আসামি গ্রেপ্তারের পর পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পরিবর্তে নতুন করে হামলা ও লুটপাট শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। বুধবার দিবাগত রাতে রেজাউল শিকদারের নেতৃত্বে ফারুক চৌকিদার, ইউনূস আলী চৌকিদার, ইদ্রিস চৌকিদার, লিটন চৌকিদার, মনরজান বিবি, আজহার চৌকিদার, ওয়াসিম চৌকিদার, উকিল চৌকিদার, জসিম চৌকিদার, বাচ্চু চৌকিদার, শাহজাহান চৌকিদার, রাজ্জাক মাদবর, নূরুল আমিন মাদবর, মোশাররফ চৌদাদারসহ অর্ধশতাধিক পরিবারের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা প্রথমে বাড়িঘরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরে ঘরের দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে লুটপাট চালায়। কোথাও কোথাও ভবনের ছাদও ফুটো করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি থেকে গরু-বাছুর, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
চর গজনাইপুর এলাকার মালয়েশিয়া প্রবাসী উকিল চৌকিদারের বাড়িতেও হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। তাঁর স্ত্রী রুবিনা আক্তার বলেন, রেজাউল শিকদার তাঁদের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় তাঁদের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছে।
ভুক্তভোগী সুমি বেগম বলেন, “ঘটনার দিন চরধুপুর এলাকায় মারামারি হয়েছে। আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় থাকেন। তিনি ওই ঘটনায় জড়িত নন। এরপরও রেজাউল শিকদার এসে ঘরপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রাতে আমাদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়।”
জসিম চৌকিদারের স্ত্রী শিমুলি বেগম অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামী লাউখোলা বাজারে ব্যবসা করেন এবং সংঘর্ষে অংশ নেননি। এরপরও তাঁকে মামলার আসামি করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, “রাতে আমাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে দুটি গরু, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে গেছে। ভয় দেখাতে ককটেল বিস্ফোরণ করা হয়। পরে আমরা জীবন বাঁচাতে বাড়ি ছেড়ে চরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছি।”
আরেক ভুক্তভোগী সুমি আক্তার বলেন, “আমার স্বামী প্রবাসে থাকেন। আমরা সংঘর্ষের বিষয়ে কিছুই জানি না। এরপরও আমাদের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট হয়েছে। ঘরের সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। এখন ঘরে থাকার কিংবা রান্না করে খাওয়ারও কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই। যারা সংঘর্ষে জড়িত ছিল তাদের বিচার হোক, একই সঙ্গে যারা নিরপরাধ মানুষের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট করেছে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ইমরান আল নাজির বলেন, “একজন মানুষ নিহত হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করাও অপরাধ। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মামলা-বাণিজ্য ও লুটপাটের অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।”
তবে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রেজাউল শিকদার। তিনি বলেন, “আমার জানামতে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তারা নিজেদের মালামাল নিজেরাই সরিয়ে নিয়ে এখন আমাদের ওপর দায় চাপাচ্ছে।”
এদিকে সংঘর্ষ ও একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাজিরা উপজেলা বিএনপির সভাপতি বজলুর রশিদ শিকদার বলেন, “ওসি সাহেব ও প্রশাসনের যে ভূমিকা পালন করার কথা ছিল, তারা তা করেননি। এ কারণেই মুলনায় এই ঘটনা ঘটেছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘর্ষের আগে দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে থাকলেও তা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। সংঘর্ষের পর একজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। এরপর প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা তৈরি হলেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় একের পর এক বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি তাঁদের। এতে পুলিশের আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা তৎপরতার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা তৎপর রয়েছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) মুহাম্মদ মহিউদ্দিন মিরাজ বলেন, “নিহত মান্নান সরদারের ঘটনায় তাঁর ছেলে বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের প্রবণতা থাকে। আমরা তা প্রতিহত করার চেষ্টা করছি। গতকাল রাতে বোমা বিস্ফোরণের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। হামলা ও লুটপাটের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
একজন নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধের ঘটনায় নিরপরাধ মানুষের বাড়িঘর আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগে এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও চাঁদাবাজির অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা বা গাফিলতির কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে প্রশাসন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









