বরিশালের আগৈলঝাড়ায় জাল দলিলের মাধ্যমে ২৭ শতাংশ জমি নিজের নামে নামজারি (মিউটেশন) করে নেওয়া এবং পরবর্তীতে ওই জমি বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে লিয়াকত আলী হাওলাদার নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বরিশাল সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিকে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় ও ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের ভাল্লুকসী গ্রামের মৃত আব্দুস ছবেদ হাওলাদারের ছেলে লিয়াকত আলী হাওলাদারের বিরুদ্ধে উত্তর ভাল্লুকসী মৌজার একটি জমি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, উত্তর ভাল্লুকসী মৌজার এসএ ৫৬ নম্বর খতিয়ানের ৩৭৪ নম্বর দাগ এবং বিএস ২৪৮ নম্বর খতিয়ানের ৫৪৯ নম্বর দাগের ২৭ শতাংশ জমির রেকর্ডীয় মালিক ছিলেন বিনোদ বিহারীর স্ত্রী উপসনা।
অভিযোগ রয়েছে, ওই জমি নিজের নামে নেওয়ার উদ্দেশ্যে লিয়াকত আলী হাওলাদার একটি দলিল তৈরি করেন। দলিলটি আগৈলঝাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ১৭১৯ নম্বর দলিল হিসেবে এবং তারিখ ১০ আগস্ট ২০১০ উল্লেখ করে উপস্থাপন করা হয়। তবে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ওই দলিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দাতা হিসেবে উপসনার নামের কোনো দলিল সাব-রেজিস্ট্রি রেকর্ডে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বরিশাল নকলখানা থেকে ১৭১৯ নম্বর দলিলের একটি রেকর্ড পাওয়া গেলেও সেখানে দাতা ও গ্রহীতার নামের সঙ্গে লিয়াকত আলী হাওলাদারের দাবি করা দলিলের কোনো মিল নেই বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বরিশাল নকলখানায় পাওয়া ১৭১৯ নম্বর দলিলে দাতা হিসেবে ভাল্লুকসী গ্রামের মৃত কার্তিক চন্দ্র তপাদারের ছেলে তপন তপাদারের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। ওই দলিলে উত্তর ভাল্লুকসী মৌজার এসএ ১১৩, নতুন ২৩৪ এবং ডিপি ১৭৪ নম্বর খতিয়ানের বিভিন্ন দাগে মোট ৩০ শতাংশ জমির বিবরণ রয়েছে। এর মধ্যে এসএ ৩৮৭, বিএস ৫৫২ দাগে ৪৫ শতাংশের মধ্যে ২২ শতাংশ এবং এসএ ৩৯০, বিএস ৫৫৪ দাগে ৪৯ শতাংশের মধ্যে ৮ শতাংশসহ মোট ৩০ শতাংশ জমির বিবরণ উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কথিত জাল দলিলের ভিত্তিতে লিয়াকত আলী হাওলাদার নিজের নামে জমিটি নামজারি করে নেন। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তিনি ওই জমি অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় একই এলাকার আজগোর আলী মৃধা বাদী হয়ে লিয়াকত আলী হাওলাদারকে বিবাদী করে বরিশাল সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলাটির সিআর নম্বর ৭১/২০২৬। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য সিআইডিকে দায়িত্ব দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
মামলার বাদী আজগোর আলী মৃধা বলেন, “আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে ওই সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছি। লিয়াকত আলী এখন জোরপূর্বক জমিটি দখলের চেষ্টা করছেন।”
স্থানীয় ফয়জর আলী মৃধা, লুৎফর রহমান ও মজিবর হাওলাদারসহ কয়েকজন জানান, তাদের জানামতে প্রায় ৪০ বছর ধরে ফরমান আলী মৃধার ছেলে আজগোর আলী মৃধা ওই সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছেন।
অভিযুক্তের বক্তব্য
অভিযোগ অস্বীকার করে লিয়াকত আলী হাওলাদার বলেন, তিনি আগৈলঝাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১০ আগস্ট ২০১০ সালের ১৭১৯ নম্বর দলিলের ভিত্তিতে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ৩৭৩৭৭০৭ নম্বর আবেদন করেন। এর ভিত্তিতে মিউটেশন মামলা নম্বর ১২০৩ হয়।
তিনি জানান, আগৈলঝাড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বায়েজীদ সরদার ১৫ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে আদেশ দেন এবং ওই আদেশের ভিত্তিতে তার নামে ২৭ শতাংশ জমি নামজারি ও রেকর্ড হয়। এর খতিয়ান নম্বর ২৫-৮১২। পরে তিনি মিউটেশন মালিক হিসেবে একই এলাকার মতলেফ মৃধার ছেলে জুলহাশ মৃধা ও রমজান মৃধার কাছে জমিটি বিক্রি করেছেন বলেও জানান।
ভূমি অফিসের বক্তব্য
বর্তমান আগৈলঝাড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. পলাশ আহমেদ বলেন, লিয়াকত আলী হাওলাদার অনলাইনে মিউটেশনের জন্য আবেদন করেছিলেন। তার আবেদনের কাগজপত্র অনলাইনেই রয়েছে। তৎকালীন কর্মকর্তা কাগজপত্র যাচাই করে রেকর্ড দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আবেদনকারী যদি জালিয়াতি করে আদালত বা ভূমি অফিসকে ভুল বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে তার দায়ভার আবেদনকারীকেই নিতে হবে।”
এদিকে জমির দলিল, নামজারি এবং মালিকানা নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে আদালতের নির্দেশে সিআইডির তদন্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয়রা। তদন্তে দলিলটি প্রকৃত না জাল, নামজারি কীভাবে হয়েছে এবং পরবর্তীতে জমি হস্তান্তরের বৈধতা ছিল কি না—এসব বিষয় স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









