ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের কাজ না করেই বিল উত্তোলনের মাধ্যমে বরাদ্ধ হরিলুট হয়েছে। এ ঘটনার নেপথ্যে ভুয়া নথিপত্রে কলকাঠি নাড়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলাল উদ্দিীনের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ না করে, আবারও কোথাও আংশিক কাজ করে বরাদ্দের পুরো টাকা তুলে নেওয়া এবং পূর্বের কাজকে নতুন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করে বরাদ্দ আত্মস্বাত করা হয়েছে। এনিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা মো: হায়াত আলী, আবু বকরসহ আরও অনেকেই।
এসব অভিযোগের বাস্তব সত্যতা নিশ্চিত করতে গত ৭ আগস্ট ২০ আগস্ট পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রাম সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। এতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের কাজ নয়ছয়ের প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ জুনের নির্ধারিত সময়ের আগেই এসব প্রকল্পের বরাদ্দ তুলে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এর আগে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একইভাবে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের অনিয়ম এবং সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে ৪ কোটি টাকার দুর্নীতি ঘটনায় অভিযোগ দায়ের হলে দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযান চালায়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে আজ পর্যন্ত ওই অভিযানের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। এ ঘটনার ধামাচাপা দিতে পিআইও আলাল উদ্দিন সফল হয়েছেন বলে দাবি আজিজুল হক নামের এক ব্যক্তির।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার রায়গঞ্জ বাজার থেকে কান্দির ঘাট বাজার রাস্তা মেরামত বাবদ ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা, নন্দীগ্রাম শামছুলের বাড়ী থেকে রফিকের চায়ের দোকান রাস্তা ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা, কলতাপাড়া টু গৌরীপুর রাস্তা থেকে দক্ষিণ দিকে বড়ইতলা রাস্তার আংশিক সলিংসহ সংস্কার এবং সাহেব কাচারী সীমান্ত থেকে কাঠবাড়ীর সালামের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে প্রকল্প অনুমোদন হলেও বাস্তবে কোন কাজ হয়নি। এমন দাবি স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিমসহ আরও অনেকের।
উপজেলার ময়লাকান্দা ইউনিয়নের গোবিন্দপুর বাজার এইচবিবি রাস্তা থেকে টিকুরীগামী রাস্তায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকার গাইডওয়াল নির্মাণ ও সংস্কার, ভেংগা পূর্বপাড়া পাকা রাস্তা থেকে মাদ্রাসা পর্যন্ত ১০ লাখ টাকার এইচবিবিকরণ, শ্যামগঞ্জ টু গৌরীপুর রাস্তার গাভীশিমুলা থেকে পূর্ব ভালুকা প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়ে খোদাবক্সের বাড়ী পর্যন্ত ৩ লাখ টাকা, অচিন্তপুর ডেকুরা বাজার রাস্তার ৩ লাখ টাকার সিসিকরণ এবং মাওহা ভাটিয়ারকোনা লালচানের বাড়ী থেকে আহম্মদপুর কামাল মেম্বারের বাড়ী পর্যন্ত ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকার রাস্তায় নামমাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ করে বরাদ্দের সমুদয় টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
এই অনিয়মের সত্যতা স্বীকার করে স্থানীয় বাসিন্দা ও কলেজ শিক্ষার্থী সোয়াদ এবং আকাশ ভিডিও বক্তব্যে বলেন, এসব প্রকল্পে অনিয়মের ঘটনায় সরেজমিনে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যথায় আমরা এলাকাবাসিকে নিয়ে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।
একইভাবে উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের দামগাও মোড়লপাড়া জামে মসজিদ থেকে ডাউকী রতনের বাড়ী পর্যন্ত ১৪ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং ধুরুয়া বাজার থেকে আগপাড়া চৌরাস্তা পর্যন্ত ১০ লাখ টাকা নামমাত্র কাজ করে বরাদ্দ আত্মস্বাত করা হয়েছে। এছাড়াও সিংজানী ভুইয়া বাড়ী সার্বজনীন পূজা মন্দিরের পাশে পকুর পাড়ে গাইডওয়াল নির্মানের জন্য ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও ৭ বছর আগের গাইডওয়াল দেখিয়ে বরাদ্দ আত্মস্বাত করা হয়।
স্থানীয় এক বৃদ্ধ ভিডিও বক্তব্যে ৭ বছর আগের গাইডওয়াল দেখিয়ে নতুন বরাদ্দ আত্মস্বাতের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রায় ৬ থেকে ৭ বছর আগে এই গাইডওয়াল হয়েছে, এবছর এখানে কোন কাজ হয়নি। ক্ষোভ প্রকাশ করে উপজেলার ডৌহাখলা এলাকার বাসিন্দা আলী আকবর বলেন, পিআইওসহ যারা রাস্তার কাজ এবং গাউডওয়াল না করেই টাকা তুলে খাইছে, আমরা তাদের বিচার চাই।
এসব অনিয়ম বিষয়ে একাধিকবার মোবাইল কল এবং ম্যাসেজ দিলেও গৌরীপুর উপজেলা পিআইও আলাল উদ্দিন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফিয়া আমিন পাপ্পা’র বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরও) মো: রেজাউল করিম সংশ্লিষ্ট ইউএনও এবং পিআইও এর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন এবং এনিয়ে তিনি কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এবিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো: সাইফুর রহমান বলেন, এই প্রকল্পগুলো কিস্তি ভিত্তিতে আসে, হয়তো ৩০ জুনের যে বরাদ্দ খরচ করার কথা তা কিছু অবিশিষ্ট থাকতে পারে। কিন্তু একেবারেই কাজ না করে বিল পরিশোধ করা কোনভাবেই কাম্য নয়। আমি জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাকে সরেজমিনে পাঠিয়ে বিষয়টি যাছাই করে দেখবো।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









