বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদল। বিনিয়োগের সহায়ক পরিবেশ তৈরির বিষয়ে প্রতিনিধিদলের কিছু প্রস্তাব ও পরামর্শ রয়েছে। সরকার সেগুলো বিবেচনায় নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
শনিবার (২২ আগস্ট) সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) উদ্যোগে নতুন ডিসপ্লে ও সেলস সেন্টার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্ক প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “এই শুল্ক শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিভিন্ন দেশের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর সাধারণ শুল্কের বাইরে বর্তমানে ১০ শতাংশ ট্যারিফ প্রয়োগ করা হয়েছে, যা সর্বনিম্ন হারের মধ্যে একটি।”
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “ভারতের যেসব ব্যবসায়ী বাংলাদেশে এসেছেন, তাদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছেন। তারা বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলবন্দরগুলো পুরোপুরি কার্যকর করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।”
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “স্থলবন্দরগুলো বন্ধ থাকার কারণে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাঁচামালের মূল্য বেড়ে যায় বলে তারা জানিয়েছেন। এ ছাড়া অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি টাস্কফোর্স এবং ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরির জন্য একটি ট্রাস্ট গঠনের প্রস্তাব এফবিসিসিআইয়ের নেতৃবৃন্দের কাছে দিয়েছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।”
বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ২৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি হওয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির তুলনায় বেশি। পৃথিবীর অনেক দেশেই আমদানি বেশি এবং রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম। এটি অস্বাভাবিক বিষয় নয়।”
রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “রপ্তানির পরিমাণ বাড়লে আমদানির পরিমাণও বাড়বে। রপ্তানি ও আমদানি মিলিয়ে দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বহুগুণ বাড়ানো প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতির আকারের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিমাণের সামঞ্জস্য থাকা দরকার।”
এ প্রসঙ্গে ভিয়েতনামের উদাহরণ দিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “ভিয়েতনামের আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণ এখন প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার। সেখানে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের সঙ্গে এটি ঠিক সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
এর আগে বিসিকের ডিসপ্লে ও সেলস সেন্টার উদ্বোধন করেন মন্ত্রী। এ সময় তিনি বলেন, “জাতীয় অর্থনীতিতে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের অবদান বর্তমানে প্রায় ৩৪ শতাংশ। সরকারের মূল লক্ষ্য এ অবদান ৫০ শতাংশে উন্নীত করা।”
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অধিক জ্বালানি-নির্ভর শিল্পের পরিবর্তে স্বল্প বিনিয়োগ ও পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।”
শিল্প খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধানের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, “দেশে প্রতিদিন সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সৌরশক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করা সম্ভব। স্টোরেজ সুবিধার মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ সন্ধ্যার পিক আওয়ারেও ব্যবহার করা যেতে পারে।”
সরকারের ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়িত হলে শিল্প খাতে লোডশেডিংয়ের সংকট অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্লটগুলোতে গ্যাসের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে রাইস হাস্ক বা ধানের তুষ ও কয়লা ব্যবহারের একটি রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে দুপুরে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বৈঠকে মাদক, অনলাইন জুয়া ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেন তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “সিলেটের আইনশৃঙ্খলা কেমন আছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আমরা কেমন দেখতে চাই। প্রথম হলো, সিলেটে আমরা কোনো মাদকের আনাগোনা দেখতে চাই না। দ্বিতীয়ত সিলেটে আমরা কোনো অনলাইন জুয়া দেখতে চাই না। সিলেটে কোনো কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আমরা দেখতে চাই না।”
বৈঠকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইমরান আহমেদ চৌধুরী, জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের শামীম, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









