কোনো শহরের স্বাধীনতা কেমন তা জানার জন্য সব সময় সেখানকার সংবিধান, সংসদ কিংবা আদালতের দিকে তাকাতে হয় না। কখনো কখনো একটি বইয়ের দোকানের তাকের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। কোন বইটি সামনে রাখা আছে, কোন বইটি আড়ালে, কোন বইটির নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে বিক্রেতা একটু থেমে যায়—এসব ছোট ছোট লক্ষণেই বোঝা যায় একটি সমাজ কতটা মুক্ত।
হংকংয়ের শাম শুই পো এলাকার ব্যস্ত রাস্তার পাশে এমনই একটি বইয়ের দোকান—‘হান্টার বুকস্টোর’। কাপড়ের দোকান, গ্যারেজ আর আধুনিক ক্যাফের ভিড়ে ছোট্ট দোকানটি যেন অন্য এক পৃথিবীর দরজা। চীনের মূল ভূখণ্ডের গুয়াংজু থেকে ২৩ বছর বয়সী চেন ঝু প্রায় প্রতি মাসেই এখানে আসেন। তার কাছে হংকংয়ে যাওয়া শুধু সীমান্ত পেরোনো নয়; কিছুক্ষণের জন্য এমন এক জগতে ঢুকে পড়া, যেখানে নিষিদ্ধ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যায়। যেখানে চিন্তার স্বাধীনতা আছে।
চার বছর আগে এক সাবেক কাউন্সিলর দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে পাওয়া যায় হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন নিয়ে বই, কর্তৃত্ববাদ নিয়ে জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম, হাজিমে ইসায়ামার অ্যাটাক অন টাইটান—এমন অনেক বই, যেগুলো চীনা কর্তৃপক্ষ ‘সংবেদনশীল’ বলে মনে করতে পারে!

জুনের শেষ দিকে পুলিশ যখন হান্টারে অভিযান চালায়, ঝু খবরটি শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন। তার ভাষায়, তিনি ‘বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন’।
হংকংয়ে ২০১৯ সালের বিশাল গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের পর স্বাধীন বইয়ের দোকানগুলো যেন নতুন প্রাণ পেয়েছিল। কিন্তু এরপর চীনের নিয়ন্ত্রণ যত শক্ত হয়েছে, এসব দোকানের জায়গা তত সংকুচিত হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা আইনকে বেইজিং স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় বলে ব্যাখ্যা করলেও সমালোচকদের অভিযোগ, এর ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হয়েছে।
জুনের ২৪ তারিখে হান্টার বুকস্টোরে তল্লাশি চালিয়ে মালিক লেটিশিয়া ওং ও আরেকজনকে রাষ্ট্রদ্রোহ ও অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং পরে জামিনে মুক্তি পান। মার্চে বুক পাঞ্চের মালিক ও তিন কর্মীকেও একই ধরনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এরপর জুলাইয়ে হংকং বইমেলা শুরুর দিন জাতীয় নিরাপত্তা পুলিশ অভিযান চালায় গ্রিনফিল্ড বুকস্টোর ও হ্যাভ আ নাইস স্টে-তে। পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই গ্রিনফিল্ড জানায়, ইজারা শেষ হলে তারা দোকান বন্ধ করে দেবে। এক মাসের মধ্যে তৃতীয় স্বাধীন বইয়ের দোকান তখন বন্ধ হওয়ার পথে।
অথচ এই দোকানগুলো শুধু হংকংয়ের পাঠকদের জন্য ছিল না। মূল ভূখণ্ডের চীনা তরুণদের কাছেও এগুলো ছিল এক ধরনের জানালা।
সাংহাইয়ের ১৯ বছর বয়সী লি বলেন, এসব দোকানে এসে তিনি ‘অনেক সম্ভাবনা দেখতে পান’ এবং নিজের পুরোনো ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করতে পারেন। তার কাছে বইয়ের দোকান মানে শুধু বই নয়—স্বাধীনতা, বন্ধুত্ব এবং নিজের মতো করে ভাবার জায়গা।
ঝুর এই খোঁজ শুরু হয়েছিল চীনের ইতিহাসের এক নিষিদ্ধ অধ্যায় থেকে। ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ঘটনা নিয়ে তার কৌতূহল বাড়তে থাকে। মূল ভূখণ্ডের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেটে যে ইতিহাস প্রায় মুছে দেওয়া হয়েছে, তিনি তার অন্য একটি বয়ান খুঁজছিলেন।
তিনি সেই সময়ের চলচ্চিত্র দেখেছেন, কিন্তু তাতেও কৌতূহল মেটেনি। শেষ পর্যন্ত তাইওয়ানের কবি ইয়াং দু-এর ‘দ্য আনবার্নড বুক’ বইটি খুঁজতে শুরু করেন। মহামারির পর ২০২৩ সালে চীন-হংকং সীমান্ত খুলে গেলে তিনি হংকংয়ে ছুটে আসেন। বহু দোকানে খুঁজেও না পেয়ে শেষ পর্যন্ত হান্টারেই বইটি পান।
বইটির চেয়ে হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বইটি খুঁজে পাওয়ার অভিজ্ঞতা।
একসময় হংকং ছিল ১৯৮৯ সালের পর চীন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের আশ্রয়। প্রতি বছর ৪ জুন তিয়েনআনমেনের নিহতদের স্মরণে মোমবাতি জ্বালানো হতো। পরে রাজনৈতিক সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ বাড়তে থাকায় সেই আয়োজনও হারিয়ে যায়।
তবু কিছু চিহ্ন রয়ে গেছে। জুনের শুরুতে হংকংয়ে গিয়ে ২০ বছর বয়সী ক্রিস একটি দোকানে দেখেছিলেন সংশ্লিষ্ট বই, সাদা মোমবাতি এবং ‘VI-IV’ লেখা মাস্কিং টেপ। রোমান সংখ্যায় লেখা এই সংকেত আসলে ৬-৪—৪ জুনের স্মৃতি।
এ যেন ইতিহাসকে প্রকাশ্যে না বলে ইতিহাসের দিকে একটু চোখ টিপে তাকানো।

এই তরুণেরা হংকংয়ের বাসিন্দা নন। কিন্তু বইয়ের দোকানগুলোতে এসে তাঁরা নিজেদের আপন মনে করেন। কারণ সেখানে এমন ইতিহাসের কথা বলা যায়, যে ইতিহাস সরকারগুলো অনেক সময় মানুষকে ভুলে যেতে শেখায়।
আর এখানেই বইয়ের দোকানের গল্পটি বইয়ের বাইরের গল্প হয়ে ওঠে।
চীনা নববর্ষে হংকংয়ে গিয়েছিলেন লি। তার কয়েক মাস আগে তাই পো এলাকায় ভয়াবহ একটি আবাসিক ভবনে আগুনে ১৬৮ জন মারা গিয়েছিলেন। হান্টার বুকস্টোরে তিনি দেখলেন একটি দেয়ালজুড়ে কালো স্টিকি নোট। মানুষ সেখানে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সমবেদনা ও সাহসের কথা লিখে রেখে গেছে।
মূল ভূখণ্ডে এমন দৃশ্য তিনি খুব কমই দেখেছেন। সেখানে বার্তা লেখার জায়গা থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার শিকার মানুষের প্রতি এভাবে প্রকাশ্য সংহতি জানানো সহজ নয়। লির মনে হয়েছে, মানুষকে অনেক সময় সরাসরি নয়, ঘুরিয়ে কথা বলতে হয়।
বইয়ের পাশে বিক্রেতাদের হাতে লেখা ছোট নোটও তাঁকে অবাক করেছিল। কোনো বই পড়ে বিক্রেতা নিজের অনুভূতি লিখে রেখেছেন, কোথাও গুরুত্বপূর্ণ একটি বাক্য চিহ্নিত করেছেন। বই তখন শুধু পণ্য নয়; পাঠক ও পাঠকের মধ্যে এক অদৃশ্য কথোপকথন।
ঝুও একই অনুভূতি পান। তিনি বলেন, সবাই বই ভালোবাসে, স্বাধীন বইয়ের দোকানকে মূল্য দেয়—তাই তাঁরা এখানে বই কিনতে আসেন।
তিনি অপরিচিত মানুষের সঙ্গে খুব একটা কথা বলেন না। তবু দোকানে কখনো নিজেকে বাইরের মানুষ মনে হয় না। বই, আলোচনা আর ছোট ছোট আয়োজন তাঁকে মনে করিয়ে দেয়—মূল ভূখণ্ডের বাইরে কোথাও অন্তত ‘একটু হলেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ আছে।
অবশ্য সেই স্বাধীনতার সীমা তিনি জানেন।
‘আপনি মূল ভূখণ্ডকে পেছনে ফেলে এসেছেন,’ ঝু বলেন। ‘আপনি জানেন, এই স্বাধীনতারও সীমা আছে। কিন্তু একেবারেই কিছু বলতে না পারার চেয়ে এটুকুও ভালো।’
এখন সেই ‘এটুকু’ জায়গাটিও ছোট হয়ে আসছে।
এক বইয়ের অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের ঢুকে বসে থাকতে দেখেছেন ঝু। তাঁরা কিছু বলেননি। শুধু অন্য সবার সঙ্গে বসে শুনেছেন। কখনো কখনো উপস্থিতিই হয়তো যথেষ্ট বার্তা।
চাপ শুধু রাজনৈতিক বইয়ের দোকানেই থামছে না। এক বই বিক্রেতা, নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে, বলেন—লাক উইন ও এলমবুক বরাবরই খুব নীরবে কাজ করেছে। প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য বা বড় আয়োজনও তারা করত না। তবু বেইজিংপন্থী সংবাদপত্র ওয়েন ওয়েই পো তাদের ‘নরম প্রতিরোধ’ ছড়ানোর অভিযোগে সমালোচনা করেছে।
কারণ সীমারেখা যখন স্পষ্ট করে দেওয়া হয় না, তখন মানুষ নিজেই নিজের সীমারেখা আঁকতে শুরু করে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের টং কিন-লংয়ের ভাষায়, কর্তৃপক্ষ হয়তো চায় মানুষ নিজেরাই বুঝে নিক কোন জায়গায় থামতে হবে—অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা আসার আগেই যেন মানুষ নিজেকে থামিয়ে দেয়।

সিচুয়ানের ত্রিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি, যাঁকে প্রতিবেদনে ‘কে’ নামে পরিচয় দেওয়া হয়েছে, এই দৃশ্য দেখে অতীতের মূল ভূখণ্ডের কথা মনে করেন। একসময় চীনের বইয়ের দোকানগুলোও ছিল আলোচনা আর বিতর্কের জায়গা। উদারপন্থী বই-ম্যাগাজিন সামনে সাজানো থাকত, নিয়মিত আলোচনা হতো। কিন্তু ২০১৫ সালের দিকে তিনি পরিবর্তন দেখতে শুরু করেন।
প্রথমে অদৃশ্য হতে থাকে নেতাদের নিয়ে কিছু বই। পরে আরও সাধারণ বইও হারিয়ে যায়। আলোচনা কমে আসে। বদলে যায় দোকানের বাতাস।
আজ তাঁর ভয় আরও সরল। আগে ভাবা যেত—চীনে বইটি না পেলে হংকংয়ে যাওয়া যাবে। এখন প্রশ্ন হলো, পরেরবার হংকংয়ে এসে দোকানটিকেই কি আর পাওয়া যাবে?
এলমবুক আগামী বছরের এপ্রিলের পর তার শারীরিক দোকান বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। হ্যাভ আ নাইস স্টেও আগস্টের শেষে বন্ধ হওয়ার কথা জানিয়েছে। অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি কোন বই ‘সমস্যাজনক’ হয়ে উঠবে, সেই অনিশ্চয়তাও তাদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।
হয়তো এ কারণেই বইয়ের দোকানের দরজা বন্ধ হওয়ার গল্পটি আসলে শুধু ব্যবসা বন্ধ হওয়ার গল্প নয়। একটি দোকান বন্ধ হলে কয়েকটি তাক, একটি ক্যাশ কাউন্টার, কয়েকটি চেয়ার হারিয়ে যায়। কিন্তু তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে এমন একটি জায়গা, যেখানে দুজন মানুষ বসে একই বই পড়ে ভিন্ন মত পোষণ করতে পারে।
তবু গল্পটি এখানেই শেষ নয়।
একজন বই বিক্রেতার কথা মনে রাখা যায়: ‘আমরা এখনো বই কিনতে পারি। এখনো পড়তে পারি। এখনো অনেক বই পড়তে পারি।’
আর ক্রিস, হান্টারে পুলিশের অভিযানের খবর শুনে ভয় পেলেও, আবার সেখানে যেতে চান।
কারণ কখনো কখনো প্রতিরোধ খুব ছোট হয়। কোনো মিছিল নয়, কোনো স্লোগান নয়। শুধু একটি বই হাতে নেওয়া, দাম পরিশোধ করা, ব্যাগে করে বাড়ি নিয়ে যাওয়া।
একটি বইয়ের দোকানের দরজা হয়তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যতক্ষণ পাঠক বইয়ের দিকে হাত বাড়ায়, ততক্ষণ সেই দরজার ওপাশের পৃথিবী পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায় না।
একটি বই কেনা তখন নিছক কেনাকাটা থাকে না—হয়ে ওঠে নীরব সমর্থন, আর নীরব প্রতিরোধ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









