ভোরের আলো ফুটতেই বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে চোখে পড়ে লালের মায়াবী ছটা। যতদূর চোখ যায়, পানির ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। কোথাও গাঢ় লাল, কোথাও হালকা গোলাপি, সবুজ জলাভূমির বুকজুড়ে যেন প্রকৃতি নিজ হাতে এঁকে দিয়েছে রঙিন এক ক্যানভাস। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলার শাপলার বিলের এমন দৃশ্য মুগ্ধ করে যে কাউকে।
প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য দেখতে প্রতি বছর শাপলা ফোটার মৌসুমে সাতলায় ভিড় করেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক, প্রকৃতিপ্রেমী ও আলোকচিত্রী। নৌকায় চড়ে বিলের বুক চিরে শাপলার রাজ্যে ঘুরে বেড়ানো, নির্মল বাতাস আর গ্রামীণ জনপদের স্বাভাবিক সৌন্দর্য, সব মিলিয়ে সাতলা হয়ে উঠেছে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনস্থল।
তবে এবার শুধু প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে নয়, পরিকল্পিত অবকাঠামোর মাধ্যমে সাতলার পর্যটন সম্ভাবনাকে নতুন মাত্রা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ তৈরি করতে শাপলার বিল এলাকায় চলছে সৌন্দর্যবর্ধন ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ।
প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন গেট। পাশাপাশি পর্যটকদের বিলের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য তৈরি হচ্ছে আধুনিক ভিউ পয়েন্ট। নৌভ্রমণকে আরও সহজ ও নিরাপদ করতে ঘাটলাসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কাজ শেষ হলে সাতলার শাপলার বিলের চেহারায় যেমন পরিবর্তন আসবে, তেমনি পর্যটকদের জন্য বাড়বে সুযোগ-সুবিধাও।
সাতলার শাপলার বিলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর স্বাভাবিক সৌন্দর্য। এখানে কোনো কৃত্রিম সাজসজ্জার প্রয়োজন পড়ে না। বর্ষা শেষে বিলের পানি যখন শান্ত হয়ে আসে, তখন পানির ওপর ফুটতে শুরু করে লাল শাপলা। সকালের কোমল আলোয় শাপলার পাপড়িতে জমে থাকা শিশির আর চারপাশের সবুজের সঙ্গে মিশে তৈরি হয় অপূর্ব এক দৃশ্য।
বিলের বুকের শাপলা দেখতে পর্যটকদের বড় একটি অংশ নৌকায় ঘুরে বেড়ান। কেউ ছবি তোলেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় কাটান, আবার কেউ প্রকৃতির কাছাকাছি কয়েকটি ঘণ্টা কাটানোর জন্য ছুটে আসেন। ফলে শাপলার মৌসুমে সাতলার গ্রামীণ জনপদেও দেখা দেয় বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এতদিন সাতলায় পর্যটকদের আগমন থাকলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। বিশেষ করে পর্যটকদের বসার জায়গা, বিলের সৌন্দর্য দেখার উপযুক্ত স্থান এবং নৌকায় ওঠানামার সুবিধা ছিল সীমিত। নতুন অবকাঠামো নির্মাণ হলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাকির হোসেন বলেন, সাতলার শাপলার বিলের সৌন্দর্য দেখতে প্রতি বছর অনেক দূর থেকে মানুষ আসে। আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া ছিল, পর্যটকদের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করা। এখন গেট, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো সুন্দরভাবে শেষ হলে সাতলায় মানুষের আগমন আরও বাড়বে।
শুধু বিনোদন নয়, সাতলার পর্যটন সম্ভাবনাকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পর্যটক বাড়লে নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খাবারের দোকান, স্থানীয় পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
স্থানীয় নৌকার মাঝি রফিকুল ইসলাম বলেন, শাপলা ফোটার সময় আমাদের নৌকায় পর্যটকরা ঘুরতে আসেন। কিন্তু ভালো ঘাট ও অন্যান্য সুবিধা থাকলে আরও বেশি মানুষ আসবেন। এতে আমাদের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট নৌযান ব্যবস্থা, নিরাপদ ঘাট, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, বসার স্থান ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সাতলার পর্যটন আরও জমজমাট হয়ে উঠবে।
উপজেলা প্রশাসন বলছে, সাতলার শাপলার বিলকে শুধু একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে নয়, পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। সে লক্ষ্যেই প্রাথমিকভাবে সৌন্দর্যবর্ধন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী সুজা বলেন, সাতলার শাপলার বিল উজিরপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এর সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখেই পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবেশদ্বার, ভিউ পয়েন্ট ও ঘাটলাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্রটিকে আরও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, সাতলার সৌন্দর্য দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে প্রচারণার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই, এখানে যারা আসবেন তারা যেন নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাতলার শাপলার বিলের মূল আকর্ষণই হলো এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। তাই পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অপরিকল্পিত স্থাপনা, প্লাস্টিক বর্জ্য ও অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ যাতে শাপলার বিলের পরিবেশ নষ্ট না করে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
প্রকৃতির নিজস্ব সৌন্দর্যের সঙ্গে আধুনিক পর্যটন সুবিধার সমন্বয় ঘটলে সাতলার শাপলার বিলের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়বে আরও দূরে। লাল শাপলার অপরূপ মায়া তখন শুধু উজিরপুর কিংবা বরিশালের নয়, দেশের পর্যটন মানচিত্রে সাতলাকে আলাদা করে চেনাবে নতুন এক পরিচয়ে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









