ভোরের আলো ফুটতেই সীতাকুণ্ডের শিল্পাঞ্চলে শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। কারখানার সাইরেন, ভারী যানবাহনের শব্দ আর শ্রমিকদের ব্যস্ত পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। জীবিকার তাগিদে বাবা-মা যখন ছুটে যান কর্মস্থলে, তখন অনেক শ্রমিক পরিবারের শিশুর দিন শুরু হয় ভিন্ন বাস্তবতায়। যাদের হাতে থাকার কথা বই-খাতা, তাদের অনেকের কাঁধেই এসে পড়ে সংসারের দায়িত্ব। অভাব আর অনিশ্চয়তার চাপে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবনও থমকে যাচ্ছে।
সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা, ভাটিয়ারী, ফৌজদারহাটসহ শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন বিভিন্ন শ্রমিক কলোনি ও বস্তিতে দেখা যায় এমন চিত্র। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড, ইস্পাত কারখানা ও অন্যান্য ভারী শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের অনেক পরিবার সীমিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সংসারের অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে অনেক শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। কেউ ছোট ভাই-বোনের দেখাশোনায় ব্যস্ত থাকে, কেউ স্থানীয় দোকানে সহযোগিতা করে, আবার কেউ পরিবারের আর্থিক সংকট সামলাতে অল্প বয়সেই নানা অনানুষ্ঠানিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। এতে ধীরে ধীরে তাদের শৈশব থেকে হারিয়ে যায় খেলাধুলা, পড়াশোনা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগ।
স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, “অনেক শিশু আগ্রহ নিয়ে স্কুলে ভর্তি হলেও পারিবারিক সমস্যার কারণে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে পারে না। বাবা-মা দুজনই কাজে থাকলে ছোট সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্ব বড় সন্তানদের ওপর পড়ে। আবার বই-খাতা, পোশাক ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর খরচও অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ।”
শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, সচেতনতার অভাবও শিশুদের শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। শ্রমিক পরিবারের অনেক অভিভাবক জীবিকার তাগিদে দিনের অধিকাংশ সময় কর্মস্থলে থাকেন। ফলে সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া কিংবা নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানোর সুযোগ অনেক সময় হয়ে ওঠে না। এতে বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ কমে গিয়ে বাড়ে স্কুলছুটের ঝুঁকি।
তবে এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। স্থানীয় কিছু তরুণ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে দরিদ্র শিশুদের বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কোথাও বিকেলভিত্তিক পাঠদান, কোথাও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, আবার কোথাও ঝরে পড়া শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এসব উদ্যোগ এখনো অপ্রতুল।
ভাটিয়ারীর এক শ্রমিক অভিভাবক বলেন, “সন্তানকে ভালোভাবে পড়ানোর ইচ্ছা আমাদেরও আছে। কিন্তু সংসারের খরচ চালাতেই অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। পড়াশোনার অতিরিক্ত খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।”
সচেতন মহলের মতে, সীতাকুণ্ডের শিল্পাঞ্চলের উন্নয়নের সঙ্গে শ্রমিক পরিবারের শিশুদের শিক্ষার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের আওতায় শ্রমিক পরিবারের শিশুদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও সহায়ক শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ঝরে পড়া শিশুদের শনাক্ত করে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শ্রমিকরা সীতাকুণ্ডের শিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের শ্রমে শিল্পের চাকা ঘোরে, অথচ তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ যদি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। আজকের শ্রমিক পরিবারের শিশুরাই আগামী দিনের দক্ষ নাগরিক। তাই তাদের হাতে শ্রমের বোঝার বদলে বই-খাতা তুলে দেওয়া এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









