প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, ‘‘দেশের কোনো পাঠদান বয়সী শিশু বা শিক্ষার্থী যেন শ্রেণিকক্ষের বাইরে না থাকে এবং প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন মানসম্মত শিক্ষা পায়, এ দুটি লক্ষ্য বাস্তবায়নেই কাজ করছে সরকার। এ দুই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পিছিয়ে থাকবে না।’’
রবিবার (২৩ আগস্ট) বিকেলে বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে প্রাথমিক শিক্ষার রূপান্তর ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত দিনব্যাপী কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রাথমিক শিক্ষায় বিদ্যমান সংকটের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। বরিশালেও এমন অনেক বিদ্যালয় রয়েছে। তবে এটি শুধু বরিশালের সমস্যা নয়, সারাদেশের চিত্র প্রায় একই।’’
তিনি বলেন, ‘‘বিগত কয়েক বছর প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি মামলা থাকায় আটকে ছিল। এ কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ৩২ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন মামলা শেষ হয়েছে। আমরা সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে কাজ করছি। যত দ্রুত সম্ভব প্রধান শিক্ষক নিয়োগ কার্যকর করা হবে। খুব বেশি সময় আর লাগবে না।’’
বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুরবস্থার বিষয়েও কথা বলেন ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, ‘‘দেশের অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর অবস্থা এখনো সন্তোষজনক নয়। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে।’’
শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘নতুন বাজেটে শিক্ষাখাতে রেকর্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জিডিপির দুই শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি। এর আগে শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে ছিল। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ বরাদ্দ পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।’’
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে চলমান স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘বর্তমানে দেশের ১৫১টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালের শুরু থেকে দেশব্যাপী সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য রয়েছে।’’
তবে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের বিলম্ব হলে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরুর সময় কিছুটা পিছিয়ে যেতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘২০২৭ সালের মধ্যেই এটি বাস্তবায়ন করা হবে।’’
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নকে সরকারের অন্যতম বড় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষা মানসম্মত হচ্ছে কি না, এটাই আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা। বিগত সময়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক জায়গায় আমরা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছি। এখন প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে, প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।’’
তিনি বলেন, ‘‘শুধু শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোই সরকারের লক্ষ্য নয়; তাদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত করানো এবং কার্যকর শিক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আগ্রহী করে তুলতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।’’
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীসংখ্যা কম থাকা বিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘‘সব শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে চাইবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর পছন্দের অধিকার রয়েছে।’’ তবে যেসব এলাকায় মানুষ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং শিশুরা মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না, সেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘প্রথমে আমরা বইপুস্তক, শিক্ষক ও শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন করে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরও কোনো বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না থাকলে তখন প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যালয় বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি অর্থের অপচয় করে কোনো প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকারের লক্ষ্য হবে প্রথমে প্রতিটি বিদ্যালয়কে মানসম্মত শিক্ষার উপযোগী করে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা। এরপরও কোথাও শিক্ষার্থী না থাকলে বাস্তবতা বিবেচনায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’’
প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তর বরিশাল বিভাগের উপ-পরিচালক মিজ নিলুফার ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মিরাজুল ইসলাম উকিল, এনডিসি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশাসন-১) মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন সরকার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









