ঝড়-বৃষ্টি কিংবা তীব্র রোদ—প্রকৃতির সব আঘাত সহ্য করে মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই পলিথিন আর কাগজের তৈরি একটি নড়বড়ে ছাউনি। কোনো এক বড় দুর্যোগে হয়তো এই শেষ আশ্রয়টুকুও উড়ে যাবে বাতাসে। গত ৫-৬ বছর ধরে এভাবেই সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং পর্যটন কেন্দ্রের ফরেস্ট বাগানে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা সালেহা বেগম। তার সাথে রয়েছে মানসিক ভারসাম্যহীন এক ছেলে এবং অবুজ এক নাতি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃদ্ধা সালেহা বেগমের স্বামীর নাম মৃত মতিউর রহমান। তাদের স্থায়ী ঠিকানা গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি ইউনিয়নের বগাইয়া গ্রামে। একসময় তাদের সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একটি সড়ক দুর্ঘটনা ওলটপালট করে দেয় পুরো পরিবারের জীবন। দুর্ঘটনায় সালেহা বেগমের ছেলে আমির হোসেন মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় একপর্যায়ে আমির তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। উপার্জনের ক্ষমতাসম্পন্ন একমাত্র ছেলে পাগল হয়ে যাওয়ার পর থেকেই পরিবারটির জীবনে নেমে আসে চরম অন্ধকার। ভিটেমাটি হারিয়ে শেষ পর্যন্ত জাফলংয়ের বনের এক কোণায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন এই বৃদ্ধা।
শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বনের গাছের সাথে পলিথিন ও কাগজ দিয়ে কোনো রকমে একটি ঝুপড়ি তৈরি করা হয়েছে। আমির হোসেন সারা দিন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ান। বৃদ্ধা সালেহা বেগম বয়সের ভারে নিজে ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না, তার ওপর মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলে আর ছোট নাতির দেখভালের পুরো দায়িত্ব তার কাঁধেই। বৃষ্টি এলে ঘরের ভেতর পানি পড়ে সবকিছু ভিজে যায়, তখন নাতি আর ছেলেকে নিয়ে এক কোণায় জবুথবু হয়ে বসে রাত পার করেন সালেহা। তীব্র শীতে হিমেল হাওয়া আর ভ্যাপসা গরমে তাদের কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই।
কথা হলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সালেহা বেগম বলেন, স্বামী হারানোর পর ছেলেই ছিল আমার একমাত্র ভরসা। কিন্তু এক সড়ক দুর্ঘটনায় সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। এই বৃদ্ধ বয়সে এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, ঠিকমতো খাওয়ারও উপায় নেই। ভাঙা ঘরে বৃষ্টিতে ভিজি, শীতে কাঁপি। বড় কোনো ঝড় এলে এই ঘর টিকবে না। মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলে আর ছোট নাতিকে নিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। সরকার যদি আমাদের একটা থাকার ঘর করে দিত এবং ছেলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করত, তবে মরার আগেও শান্তি পেতাম।
বৃদ্ধা সালেহা বেগমের এই অসহায়ত্বের দিকে তাকিয়ে হৃদয়বান ব্যক্তি বা প্রশাসন কি বাড়াবে সহায়তার হাত? একটি স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই আর ছেলের চিকিৎসার আকুতি এই সত্তরোর্ধ্ব মায়ের।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









