পৃথিবীর খাদ্য ব্যবস্থায় মাটি, পানি, বীজ, সার, সেচ ও কৃষকের শ্রমের পাশাপাশি কিছু ক্ষুদ্র জীব নীরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মৌমাছি তাদের অন্যতম।
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্যশস্য কোনো না কোনোভাবে পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল এবং এর বড় অংশ সম্পন্ন করে মৌমাছি। তাই মৌমাছির সংকট শুধু একটি পতঙ্গের সংকট নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টি, কৃষকের আয়, জীববৈচিত্র্য ও মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ। ফুল থেকে মধু ও পরাগ সংগ্রহের সময় মৌমাছি এক ফুলের পরাগরেণু অন্য ফুলে পৌঁছে দেয়, ফলে ফল ও বীজ সৃষ্টি হয়। আম, লিচু, তরমুজ, সরিষা, সূর্যমুখী, কফি, আপেল, বাদাম ও টমেটোর মতো অসংখ্য ফসলের উৎপাদনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একটি মৌচাকের অসংখ্য কর্মী প্রতিদিন হাজার হাজার ফুলে বিচরণ করে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরাগায়নের ফলে ফসলের উৎপাদন ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাই মৌমাছিকে যথার্থই প্রকৃতির নীরব কৃষিশ্রমিক বলা যায়।
পরাগায়ন উদ্ভিদ জগতের জীবনচক্রের একটি মৌলিক প্রক্রিয়া। বাতাস, পানি, পাখি, প্রজাপতি ও অন্যান্য পতঙ্গ এতে ভূমিকা রাখলেও মৌমাছির দক্ষতা ও ব্যাপক বিচরণ একে গুরুত্বপূর্ণ পরাগবাহকে পরিণত করেছে। ফুল থেকে মধু ও পরাগ সংগ্রহের সময় মৌমাছি এক ফুলের পরাগরেণু অন্য ফুলে পৌঁছে দিয়ে একই সঙ্গে খাদ্য সংগ্রহ ও কৃষি উৎপাদনের অপরিহার্য কাজটি সম্পন্ন করে। প্রকৃতির এই সূক্ষ্ম নিয়মে মৌমাছি খাদ্য গ্রহণের বিনিময়ে উদ্ভিদের বংশবিস্তারে সহায়তা করে, যা কৃষি ও প্রকৃতির পারস্পরিক নির্ভরতার গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে। বাংলাদেশের সরিষা, ধনে, কালোজিরা, বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষেও মৌমাছির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, সরিষা ক্ষেতে মৌচাক স্থাপন করলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে এবং পরাগায়নের ফলে বীজের গুণগত মানও উন্নত হয়। তাই মৌমাছিকে শুধু মধু উৎপাদনকারী পতঙ্গ হিসেবে দেখা যথার্থ নয়। মৌচাষ ও ফসল উৎপাদন সমন্বিত করা গেলে কৃষক একই সঙ্গে ফলন বাড়ানোর পাশাপাশি মধু বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করতে পারেন।
বর্তমানে পৃথিবীতে ২০ হাজারের বেশি প্রজাতির মৌমাছি থাকলেও এর একটি বড় অংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। কৃষির আধুনিকীকরণ, পরিবেশগত পরিবর্তন, রাসায়নিক দূষণ, আবাসস্থল ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তন পরস্পর যুক্ত হয়ে এই সংকট তৈরি করছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহার। বিশেষ করে, নিওনিকোটিনয়েড জাতীয় কীটনাশক মৌমাছির স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করে চলাচল, খাদ্য সংগ্রহ ও দিক নির্ণয়ের ক্ষমতা ব্যাহত করতে পারে।
ফলে মৌমাছি চাক খুঁজে না পেয়ে মারা যেতে পারে এবং পুরো মৌকলোনিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফুল ফোটার সময়ে কীটনাশক প্রয়োগ করলে বিষাক্ত রাসায়নিক সরাসরি মৌমাছির দেহে পৌঁছাতে পারে; এমনকি মধু ও পরাগেও এর অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে। তাই কৃষকের ফসল রক্ষার প্রয়োজন ও পরাগবাহক সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনভিত্তিক কীটনাশক ব্যবহার এবং ফুল ফোটার সময়ে স্প্রে এড়িয়ে চলা এই ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মৌমাছির সংকটকে আরো জটিল করছে জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খরা, অতিবৃষ্টি ও ঋতুচক্রের অস্বাভাবিকতায় তাদের জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। ফুল ফোটার সময় বদলে গেলেও মৌমাছির খাদ্য সংগ্রহের সময় অপরিবর্তিত থাকলে উদ্ভিদ ও পরাগবাহকের মধ্যে সময়গত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, ফলে প্রয়োজনের সময়ে পর্যাপ্ত খাদ্য নাও মিলতে পারে। অতিরিক্ত তাপ, খরা, ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাতও মৌচাক ও মৌমাছির স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে বন উজাড়, শহরায়ন, শিল্পায়ন, রাস্তা নির্মাণ ও কৃষিজমির পরিবর্তনে গ্রামবাংলার মাঠ, পুকুরপাড়, ঝোপঝাড়, গাছপালা ও বুনোফুলের বৈচিত্র্যময় আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। মৌমাছির জন্য শুধু একটি ফুলের ক্ষেত যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফুল, নিরাপদ আশ্রয় ও তুলনামূলক দূষণমুক্ত পরিবেশ।
একফসলি কৃষিতে জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় খাদ্যের বৈচিত্র্যও নষ্ট হয় এবং বছরের অন্য সময়ে খাদ্যঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা মৌমাছির পুষ্টি ও কলোনির বিকাশ ব্যাহত করে। পাশাপাশি বায়ুদূষণ, ভারী ধাতু, অন্যান্য দূষক, রোগ ও পরজীবী মৌকলোনিকে দুর্বল করে। ভ্যারোয়া মাইট মৌমাছির কলোনি ধ্বংসের একটি গুরুতর হুমকি। দূষিত ও চাপপূর্ণ পরিবেশে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে এসব ক্ষতির মাত্রা আরো বাড়তে পারে।
মৌমাছির সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেলে এর প্রভাব কৃষি থেকে বাজার হয়ে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টিতে পৌঁছাবে। ফল, সবজি ও তেলবীজ জাতীয় ফসলের উৎপাদন কমলে খাদ্যের বৈচিত্র্যও হ্রাস পাবে। কারণ, শুধু ক্যালরি সরবরাহকারী প্রধান খাদ্যশস্য দিয়ে পূর্ণ পুষ্টি নিশ্চিত করা যায় না; ফল, সবজি, বাদাম ও তেলবীজ ভিটামিন, খনিজ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসব পরাগায়ন নির্ভর ফসলের সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়তে পারে এবং নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে পুষ্টিকর ও তুলনামূলক ব্যয়বহুল খাবার কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে মৌমাছির সংকট পরিবেশগত সমস্যা থেকে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার সংকটে রূপ নিতে পারে। এর প্রভাব কৃষিজমির বাইরেও বিস্তৃত। বহু বুনোউদ্ভিদের বংশবিস্তারে পরাগায়নকারী পতঙ্গ অপরিহার্য।
মৌমাছির মতো পরাগবাহক কমে গেলে কিছু উদ্ভিদের প্রজনন ব্যাহত হবে এবং সেসব উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়ও সংকুচিত হতে পারে। এভাবে একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গের সংখ্যা হ্রাস পুরো খাদ্যজাল ও বাস্তুতন্ত্রে ধাপে ধাপে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মৌমাছির ডানার ক্ষুদ্র কম্পনের সঙ্গে প্রকৃতির বৃহৎ ভারসাম্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য মৌমাছি ও পরাগায়নকারী পতঙ্গের গুরুত্ব আরো বেশি। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, বিপুল ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদনের কারণে পরাগায়নকারী পতঙ্গ সংরক্ষণকে কৃষিনীতি ও কৃষি সম্প্রসারণের অংশ করা প্রয়োজন। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সরিষাক্ষেত, লিচুবাগান ও সুন্দরবনে মৌচাষের সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে মৌচাষ গ্রামীণ মানুষের বাড়তি আয়ের কার্যকর উৎস হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমির পরাগায়ন সেবাও শক্তিশালী করতে পারে।
অনেক কৃষক এখনো মৌমাছিকে শুধু মধু উৎপাদনকারী পতঙ্গ মনে করেন; কৃষি উৎপাদনে তাদের পরাগায়ন সেবা সম্পর্কে সচেতনতা সীমিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে কৃষকের কাছে মৌমাছির ফলন বৃদ্ধির ভূমিকা তুলে ধরতে হবে, যাতে মৌমাছি সংরক্ষণ পরিবেশবাদীদের দাবি না হয়ে কৃষকের নিজস্ব উৎপাদন স্বার্থে পরিণত হয়। মৌচাষ সম্প্রসারণে প্রশিক্ষণ, মানসম্মত মৌচাক, কলোনি ব্যবস্থাপনা, রোগ ও পরজীবী নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণ, আর্থিক সহায়তা ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। এতে কৃষকের বাড়তি আয় ও কৃষিজমিতে পরাগায়নকারী মৌমাছির উপস্থিতি দুটোই বাড়তে পারে। তবে এর পাশাপাশি রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় মৌপ্রজাতি সংরক্ষণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বন্য
মৌমাছি রক্ষার উদ্যোগ শুধু মৌচাক স্থাপন বা মৌচাষ সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। কৃষিজমির চারপাশে ফুলগাছ, বনজ গাছ ও স্থানীয় বুনোউদ্ভিদ সংরক্ষণ করে কৃষির সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে। ক্ষেতের পাশে বিভিন্ন সময়ে ফুল দেয় এমন উদ্ভিদ রাখলে মৌমাছির জন্য দীর্ঘ সময় খাদ্যের উৎস তৈরি হবে। পাশাপাশি কীটনাশকের ব্যবহার প্রয়োজনভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত করতে হবে এবং ফুল ফোটার সময়ে নির্বিচারে স্প্রে বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব বালাই ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে।
স্কুল, কলেজ, কৃষি প্রশিক্ষণ, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে শিশু থেকে কৃষক পর্যন্ত সবাইকে মৌমাছির অপরিহার্য ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির বর্তমান অবস্থা, আবাসস্থল, রোগবালাই, কীটনাশকের প্রভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও কৃষিতে তাদের অর্থনৈতিক অবদান নিয়ে দেশভিত্তিক ও অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা জরুরি। সরকার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং কৃষি সম্প্রসারণে পরাগায়নকারী পতঙ্গ সংরক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরিবেশবান্ধব কৃষিনীতি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও নিরাপদ বালাই ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন।
খাদ্য নিরাপত্তাকে শুধু ধান, গম বা আলুর উৎপাদন দিয়ে বিচার করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত উৎপাদন, খাদ্যের বৈচিত্র্য, পুষ্টিমান, পরিবেশের ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা। এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ পরাগায়ন, যার প্রধান কারিগর মৌমাছি। তাই মৌমাছি শুধু মধুর উৎস নয়, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের নীরব অংশীদার। তাদের সংখ্যা কমলে খাদ্য ও পুষ্টি সংকট, কৃষকের আয় হ্রাস এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। তাই কৃষিতে বিষের ব্যবহার কমানো, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা, মৌচাষ উৎসাহিত করা এবং জলবায়ু সহনশীল ও গবেষণাভিত্তিক কৃষি গড়ে তোলার মাধ্যমেই মৌমাছিকে রক্ষা করতে হবে।
লেখক: কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









