ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়ে দেশটিকে ‘অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ’ করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।
একই সঙ্গে তিনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সহযোগিতা না করা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধ এখন অনেকটা অচলাবস্থায় পড়েছে। শান্তি আলোচনা থমকে আছে এবং ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।
এর আগে বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণার কথা বলেছিলেন। তবে সোমবারের ঘোষণায় ইরান ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং নিষেধাজ্ঞাগুলো কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়েও কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
বেসেন্ট সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বজুড়ে ইরানের এই স্বৈরাচারী সরকারকে টিকিয়ে রাখার সব ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তার পথ বন্ধ করে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য, যাতে শেষ পর্যন্ত তেহরান পুরোপুরি একা হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনব। এটি এই সরকারের অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের অভিযানে যোগ দেবে না, তাদেরও ইরানের সঙ্গে একই ধরনের বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়তে হবে।
বেসেন্ট জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের নেতাদের ফোন করে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন করে বাড়ানো সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের—
ডিজিটাল সম্পদ প্রযুক্তি সোনা বিমান চলাচল নৌপরিবহন খাতকে লক্ষ্য করা হবে।
ইরানের যেসব খাত নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায়-
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, সম্প্রসারিত সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে লক্ষ্য করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—ডিজিটাল সম্পদ (ক্রিপ্টোকারেন্সি), প্রযুক্তি খাত, স্বর্ণ ব্যবসা, বেসামরিক বিমান চলাচল, জাহাজ ও শিপিং খাত।
এ ছাড়া ইরানের তেল বিক্রি থেকে আয়, অস্ত্র সংগ্রহ এবং সাইবার কার্যক্রমে সহায়তার অভিযোগে ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুরসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানও এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে।
বেসেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ইরানের পক্ষে অর্থ পাচারে সহায়তাকারী যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।’
ইরানের প্রতিক্রিয়া-
ইরান অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকিকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেছে, ওয়াশিংটন ‘আরেকটি পরাজয়ের’ মুখোমুখি হবে।
ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরেই এসব পরিকল্পনার অপেক্ষায় ছিলাম।
সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিল এবং এখনো প্রস্তুত রয়েছে। এসব ঘটনা সামাল দেওয়ার জন্য আমাদের দুই বছরের একটি পরিকল্পনা রয়েছে।’
দশকের পর দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান-
ইরান দশকের পর দশক ধরে নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করে আসছে। নিষেধাজ্ঞার বিধিনিষেধ এড়াতে দেশটি জটিল আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগেও ইরান প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছিল, যার বেশিরভাগই যেত চীনে।
সোমবার চীনের ব্যাংকগুলোও নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, ‘কেউই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে নয়।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলী ভায়েজ বলেন, বিভিন্ন অর্থনৈতিক উপায় ব্যবহার করে ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে ওয়াশিংটন। তবে ইরান ‘এসব চাপ আগেও মোকাবিলা করেছে।’
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম হলেও তেহরান মনে করে, এই চাপ সহ্য করার মতো সক্ষমতা তাদের রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপের জবাবে ইরান সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হরমুজ প্রণালীতে তেল রপ্তানি কমেছে-
সামুদ্রিক চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরানের দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হতো। কিন্তু আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে তা কমে মাত্র ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।
সোমবারের একটি ঘটনায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়েছে। ওমানের উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ‘একটি অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র’ আঘাত হানে। এতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ হতাহত হয়নি বলে জানিয়েছে ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)।
এদিকে, সোমবার সাংবাদিকদের মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, অর্থনৈতিক চাপের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার সম্ভাবনা বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী বা ইরানের আশপাশের কোনো এলাকায় সামরিক হামলার সম্ভাবনা আমরা কোনোভাবেই বাদ দিচ্ছি না।’
সূত্র: এএফপি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









