কৃষকের ঘরে যখন ফসল ওঠার সময়, তখন সার না পাওয়া নিঃসন্দেহে এক ভয়াবহ সংকট। কিন্তু সেই সংকটের প্রতিক্রিয়ায় গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার লুটের ঘটনা তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি দেশের কৃষি ব্যবস্থাপনা, সার বিতরণব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক তদারকির গভীর দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি।
ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো চাহিদা ও বরাদ্দের বিপুল ব্যবধান। উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভূরুঙ্গামারীতে সারের চাহিদা প্রায় চার হাজার বস্তা, অথচ বরাদ্দ হয়েছে মাত্র এক হাজার ৩২০ বস্তা। এই ঘাটতি যদি বাস্তব হয়ে থাকে, তাহলে কৃষকের মধ্যে সার না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তার ওপর স্থানীয় কৃষকেরা একাধিকবার ডিলারের কাছে গিয়েও সার পাননি- এমন অভিযোগও করেছেন। অথচ খোলাবাজারে বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছিল বলে তাঁদের অভিযোগ। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
কৃষকের ক্ষোভের পেছনে বাস্তব সংকট থাকলেও গুদাম ভেঙে সার নেওয়ার মাধ্যমে সেই সংকটের সমাধান হতে পারে না। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি যেমন ঘটে, তেমনি সুষ্ঠু বিতরণব্যবস্থা আরো বিশৃঙ্খল হয়। আজ যদি সার, কাল বীজ বা অন্য কোনো কৃষি উপকরণ নিয়ে একই ধরনের ঘটনা ঘটে, তা কৃষি অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে। তবে শুধু কৃষকদের দায়ী করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। সার কোথায় গেল, নির্ধারিত ডিলার কতটা সার উত্তোলন করেছেন, কৃষকদের মধ্যে কীভাবে তা বিতরণ করার কথা ছিল, বাস্তবে কতটা বিতরণ হয়েছে এবং খোলাবাজারে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগের ভিত্তি কতটা- এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। প্রয়োজনে ডিলারের মজুত, বিক্রয় রেজিস্টার ও বরাদ্দের হিসাব তদন্ত করে দেখা উচিত। অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারকে সার বরাদ্দের বাস্তবতা নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে। কৃষকের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বরাদ্দ দিয়ে সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে আমন মৌসুমে কোন এলাকায় কত সার প্রয়োজন, কতটা মজুত আছে এবং কত দ্রুত তা কৃষকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব- এসব বিষয়ে আগাম ও স্বচ্ছ পরিকল্পনা থাকা দরকার। ডিলারের গুদামে কত সার ঢুকল এবং কত সার বিক্রি হলো, সেই তথ্যও স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের কাছে সহজে দৃশ্যমান করা যেতে পারে। কৃষকের ক্ষোভকে অবহেলা করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি সেই ক্ষোভ থেকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার বৈধতা দেওয়াও সমান বিপজ্জনক। কৃষক দেশের খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান কারিগর। তাঁদের প্রয়োজনীয় সার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; আর কৃষকেরও দায়িত্ব হলো আইনসম্মত পথে নিজের দাবি আদায় করা।
ভূরুঙ্গামারীর ঘটনা তাই সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দরকার। ১৯৭ বস্তা সার উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনার মূল কারণও উদ্ধার করতে হবে। শুধু লুট হওয়া সার ফিরিয়ে আনলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; সার সংকট কেন তৈরি হলো, বরাদ্দ কেন কম, বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং কৃষকের কাছে ন্যায্য মূল্যে সার পৌঁছাতে কোথায় ব্যর্থতা- এসব প্রশ্নের জবাব চাই।
কৃষকের গুদাম ভাঙার প্রয়োজন হবে না- এমন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও পর্যাপ্ত সার সরবরাহ ব্যবস্থাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ, কৃষকের হাতে সময় কম; আর কৃষির সংকটকে অবহেলা করার মূল্য শেষ পর্যন্ত পুরো দেশকেই দিতে হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









