যদি একটি ক্ষেত নিয়মিত পরিচর্যা না করা হয়, তবে আগাছাই একদিন পুরো ক্ষেত দখল করে নেয়। শুরুতে তা তুচ্ছ মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সেটিই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যেমন বলা হয়, ‘আজ যে গাছ ছোট, কাল সেটিই বন হবে।’ বন ভালোও হতে পারে, আবার নিয়ন্ত্রণহীন হলে মানুষের পথও আটকে দিতে পারে। একসময় সেই আগাছা ফসলের আলো-বাতাস কেড়ে নিয়ে পুরো ক্ষেতের উৎপাদন ক্ষমতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন বোঝা যায়- সমস্যা বড় হওয়ার পর সমাধান খোঁজার চেয়ে সময় থাকতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার বিষয়টিও আজ ঠিক তেমন একটি আলোচনার বিষয়। এ খাত বহু মানুষের জীবিকার উৎস হলেও এর দ্রুত, অপরিকল্পিত ও কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাই এখনই একটি জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা জরুরি।
আমার মতে, সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান এবং কার্যকর জাতীয় নীতিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে নতুন ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার উৎপাদন, সংযোজন ও নতুন করে রাস্তায় নামানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। শুধু ঘোষণা নয়, নতুন উৎপাদন কার্যকরভাবে বন্ধ করতে উৎপাদনকারী ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান, যন্ত্রাংশের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নতুন যান নিবন্ধন বা অনুমোদনের প্রতিটি স্তরে নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্তমানে চলমান যানগুলোর সংখ্যা, মালিকানা, চালক, রুট ও প্রযুক্তিগত মানের একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডাটাবেইজ তৈরি করতে হবে।
আজ সারা দেশে ঠিক কত ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা চলছে, তার নির্ভুল ও সর্বজনস্বীকৃত পরিসংখ্যান সহজলভ্য নয়। অথচ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এ ধরনের বাহনের উপস্থিতি দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। প্রশ্ন হলো- এই বৃদ্ধির সীমা কোথায়? কোনো শহরের সড়কের ধারণক্ষমতা, জনসংখ্যা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও গণপরিবহন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে অনির্দিষ্টকাল নতুন যান যুক্ত হতে থাকলে তার পরিণতি কী হবে?
চালক বাড়ছে- কিন্তু তাদের নাগরিক জীবন নিয়ে পরিকল্পনা কোথায়?
এই আলোচনায় শুধু যানবাহন নয়, এর সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোর জীবনকেও দেখতে হবে। বিপুলসংখ্যক চালক যদি ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে এসে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাহলে প্রশ্ন করতে হবে- তাদের আবাসন কোথায়? নিরাপদ পানি কোথায়? পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট ও স্যানিটেশন কোথায়? স্বাস্থ্যসেবা কোথায়? তারা কোথায় এবং কী মানের খাবার খাচ্ছেন? তাদের সন্তানরা কোথায় বসবাস করছে এবং কীভাবে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে?
একজন চালক দিনের আট, দশ বা বারো ঘণ্টা রাস্তায় থাকলে তার জন্য পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। যদি শহরের পরিবহনকেন্দ্র ও অটোরিকশা চলাচলের এলাকায় পর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুবিধা না থাকে, তাহলে সেটি শুধু চালকের সমস্যা নয়- জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, দুর্গন্ধ, পানি ও পরিবেশ দূষণ এবং নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রশ্ন। তাই কোথায় কত চালক কাজ করছেন এবং তাদের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেট, নিরাপদ পানি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের সুযোগ আছে কি না- তা জরিপ করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একইভাবে নিম্নমানের বা অস্বাস্থ্যকর খাবার, অনিরাপদ পানি এবং অস্বাস্থ্যকর আবাসন চালকদের নিজেদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি বৃহত্তর নগর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একটি আধুনিক রাজধানীতে লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি থাকবে অথচ তাদের মৌলিক নাগরিক সুবিধার কোনো পরিকল্পনা থাকবে না- এটি টেকসই নগরায়ন হতে পারে না।
আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঢাকায় জীবিকার জন্য আসা এই বিপুল জনগোষ্ঠী কোথায় বসবাস করছে, কোন এলাকা থেকে আসছে, তাদের পরিবার কোথায় এবং তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার পরিস্থিতি কী- এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক গবেষণা দরকার। মানুষের শহরে আসার অধিকার অবশ্যই রয়েছে; কিন্তু নগর পরিকল্পনাকেও সেই জনসংখ্যার চাপ ধারণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা ও প্রধান সড়কের প্রশ্ন
ধীরগতির যানবাহন যখন দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য মোটরযানের সঙ্গে একই সড়কে চলাচল করে, তখন গতির বৈসাদৃশ্য থেকে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দুর্ঘটনার পেছনে বেপরোয়া গতি, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কের নকশাগত ত্রুটি, চালকের অদক্ষতা এবং আইন অমান্যসহ বহু কারণ রয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনাহীনভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন গতির যান একই করিডোরে চালানোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ঢাকাসহ দেশের প্রধান মহানগরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ আর্টেরিয়াল রোড, মহাসড়ক ও দ্রুতগতির যান চলাচলের করিডোর ধাপে ধাপে ধীরগতির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশামুক্ত করতে হবে। কোথায় এ যান চলতে পারবে, কোথায় পারবে না- তা বৈজ্ঞানিক ট্রাফিক স্টাডির ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে পাড়া-মহল্লা, সংযোগ সড়ক বা নির্দিষ্ট ফিডার রুটে নিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচলের সুযোগ রাখা যেতে পারে।
ঢাকাকে সচল রাখতে হলে সড়কের শ্রেণিবিন্যাস এবং যানবাহনের শ্রেণিবিন্যাস- দুটোকেই মানতে হবে। যে সড়ক যে গতির ও যে ধরনের যানবাহনের জন্য উপযোগী, সেখানে সেই যানই চলবে- এ নীতি প্রতিষ্ঠার কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প নেই।
শ্রমবাজারে নতুন ভারসাম্যহীনতা?
এই সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক শ্রমবাজার। কৃষি, নির্মাণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, মিনি কারখানা, ওয়ার্কশপ, উৎপাদন এবং বিভিন্ন সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক পাওয়ার সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। এর পেছনে মজুরি, কর্মপরিবেশ, দক্ষতার ঘাটতি, অভিবাসনসহ বহু কারণ কাজ করে।
তবে এটিও গবেষণার দাবি রাখে, তুলনামূলক দ্রুত নগদ আয়ের প্রত্যাশায় গ্রাম ও উৎপাদনমুখী খাত থেকে কত মানুষ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানোর দিকে চলে যাচ্ছেন। যদি অধিক আয়ের প্রত্যাশায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ঢাকা ও অন্যান্য শহরে এসে অটোরিকশা চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নেয় এবং এর ফলে কৃষি, শিল্প, নির্মাণ ও ক্ষুদ্র উৎপাদন খাতে শ্রমিকের ঘাটতি আরো তীব্র হয়, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উৎপাদনশীলতার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
বিশেষ করে, কৃষির ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে, সময়মতো বীজ বপন ও ফসল সংগ্রহে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং কৃষককে কৃষিকাজ থেকে আরো নিরুৎসাহিত করতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত এই প্রশ্নকে তাই শুধু পরিবহননীতির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না।
রাষ্ট্রকে জানতে হবে- মানুষ কেন উৎপাদনমুখী কাজ ছেড়ে এই পেশায় আসছেন? মজুরির পার্থক্য কত? কৃষি ও শিল্পে কাজের পরিবেশ কি যথেষ্ট আকর্ষণীয়? দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কীভাবে শ্রমবাজারে নতুন ভারসাম্য আনা যায়?
পরিচয়, নিবন্ধন ও আইনশৃঙ্খলা
আরেকটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজধানীতে বাণিজ্যিকভাবে যান চালানো ব্যক্তিদের একটি স্বচ্ছ নিবন্ধন ও পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা থাকা দরকার। এটি কাউকে সন্দেহভাজন বা অপরাধী হিসেবে গণ্য করার জন্য নয়; বরং যাত্রী নিরাপত্তা, চালকের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে প্রয়োজন।
কোনো চালককে তার পেশার কারণে অপরাধী, সন্ত্রাসী বা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য ধরে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তবে কারো বিরুদ্ধে যদি বৈধ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিভুক্ত তথ্য থাকে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে পলাতক আসামি, নিষিদ্ধ সংগঠনের সক্রিয় সদস্য বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত কোনো ব্যক্তি যাতে এই খাতসহ কোনো পেশার আড়ালে আত্মগোপন করতে না পারে, সে জন্য আইনসম্মত পরিচয় যাচাই ও তথ্যব্যবস্থা কার্যকর করা যেতে পারে।
একইভাবে কোনো ঘটনা ঘটলে সংঘবদ্ধভাবে সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর, সহিংসতা, হুমকি বা মব তৈরির অভিযোগ উঠলে সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। অপরাধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাজ; কোনো পেশার সব মানুষকে তার জন্য দায়ী করা যাবে না। কিন্তু মব সহিংসতার ক্ষেত্রেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে- কে চালক, কে মালিক, কে রাজনৈতিক কর্মী, সেটি বিবেচ্য নয়।
প্রত্যেক বৈধ চালকের ছবিসহ ডিজিটাল পরিচয়পত্র, যানবাহনের ইউনিক নম্বর, মালিকের তথ্য, অনুমোদিত রুট এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে থাকা উচিত। যাত্রীও যেন সহজে কিউআর কোড বা নম্বরের মাধ্যমে যান ও চালকের বৈধতা যাচাই করতে পারেন।
অর্থনীতি ও নগরের উৎপাদনশীলতা
যানজট শুধু বিরক্তির বিষয় নয়; এর অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। রাস্তায় অতিরিক্ত সময় নষ্ট হলে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমে। পরিকল্পনাহীনভাবে কোনো একটি শ্রেণির যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকলে সড়কের সামগ্রিক সক্ষমতা ও গণপরিবহনের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা পরিমাপ করা দরকার।
সড়ক একটি সীমিত জাতীয় সম্পদ। তাই কে কত কর দেয়- শুধু তার ভিত্তিতে নয়; বরং সর্বাধিক মানুষের নিরাপদ, দ্রুত ও দক্ষ চলাচল নিশ্চিত করার ভিত্তিতে সড়কের ব্যবহার নির্ধারণ করতে হবে।
ব্যাটারি ও পরিবেশের ভবিষ্যৎ সংকট
অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির নির্দিষ্ট আয়ু রয়েছে। বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি কয়েক বছর পর কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ভাঙা হচ্ছে, কে পুনর্ব্যবহার করছে এবং লেড ও অ্যাসিড কোথায় নিষ্কাশিত হচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনিরাপদ পুনর্ব্যবহার হলে লেড ও অ্যাসিড মাটি, পানি ও পরিবেশ দূষিত করতে পারে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিটি ব্যাটারির উৎপাদন বা আমদানি থেকে শুরু করে ব্যবহার ও চূড়ান্ত রিসাইক্লিং পর্যন্ত ট্রেসযোগ্য ব্যবস্থা থাকা উচিত। অনুমোদনহীন ব্যাটারি ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং উৎপাদক/আমদানিকারকের ওপর ব্যবহৃত ব্যাটারি ফেরত নেওয়ার দায়িত্ব আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
জীবিকা বন্ধ নয়, পরিকল্পিত রূপান্তর
এটিও সমানভাবে সত্য যে অটোরিকশা চালকেরা বাংলাদেশেরই নাগরিক এবং তাদের আয়ের ওপর পরিবার নির্ভরশীল। বর্তমানে যারা বৈধভাবে এই পেশায় আছেন, তাদের জীবিকা একদিনে বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত বা মানবিক সমাধান নয়।
এই কারণেই বর্তমান চালকদের জীবিকা এবং নতুন যান উৎপাদন- দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখতে হবে। বর্তমান চালকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট রূপান্তরকাল দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই সময়ে নতুন অটোরিক্সা উৎপাদন করে সমস্যার আকার আরো বড় করার যৌক্তিকতা নেই।
সরকার একটি জাতীয় রূপান্তর কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে- কারিগরি প্রশিক্ষণ, ড্রাইভিং ও মেকানিক্যাল দক্ষতা, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা, নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানার দক্ষ শ্রম, ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্ক, ওয়েল্ডিং, মেশিন অপারেশন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চালকদের বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করা যেতে পারে।
এখন যে পদক্ষেপগুলো জরুরি
প্রথমত: পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ও সক্ষমতা মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত নতুন ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা উৎপাদন, সংযোজন ও নতুন করে রাস্তায় নামানোর ওপর কার্যকর স্থগিতাদেশ বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: বর্তমানে চলমান সব যান ও চালকের জাতীয় নিবন্ধন এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত: ঢাকা ও অন্যান্য মহানগরের প্রধান সড়ক, মহাসড়ক ও দ্রুতগতির করিডোরে এসব যান চলাচল পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে নির্দিষ্ট ফিডার ও স্থানীয় রুট নির্ধারণ করতে হবে।
চতুর্থত: চালকদের জন্য পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, বিশ্রাম ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নগর পরিবহন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
পঞ্চমত: ব্যাটারি সংগ্রহ, ফেরত নেওয়া, পুনর্ব্যবহার এবং বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা করতে হবে।
ষষ্ঠত: কৃষি, শিল্প, নির্মাণ ও উৎপাদন খাত থেকে শ্রমশক্তি অস্বাভাবিক হারে অন্যদিকে সরে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা করতে হবে এবং উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থানকে আরো আকর্ষণীয় করতে হবে।
সপ্তমত: যাত্রী ও চালক- উভয়ের নিরাপত্তায় পরিচয় ও যানবাহন যাচাইয়ের ডিজিটাল ব্যবস্থা করতে হবে এবং সংঘবদ্ধ সহিংসতা, চাঁদাবাজি, মব সৃষ্টি বা অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক বা পেশাগত পরিচয় নির্বিশেষে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকা শহরকে বাঁচাতে সিদ্ধান্ত এখনই
বাংলাদেশের উন্নয়নের এই পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত। কোনো খাতকে সম্পূর্ণ অবহেলা করা যেমন সমাধান নয়, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন সম্প্রসারণকেও কর্মসংস্থানের নামে অনির্দিষ্টকাল চলতে দেওয়া যায় না।
আজকের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সমস্যার আকার আর বাড়তে না দেওয়া। একটি পাত্র উপচে পড়লে প্রথম কাজ নতুন করে পানি ঢালা বন্ধ করা; তারপর ভেতরের পানি কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। পূর্ণাঙ্গ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নতুন উৎপাদন ও অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ বন্ধ করে বিদ্যমান যানগুলোকে ধাপে ধাপে নিয়ম, রুট, প্রযুক্তিগত মান ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
প্রশ্নটি শুধু অটোরিকশা নয়। প্রশ্নটি ঢাকার ভবিষ্যৎ, জনস্বাস্থ্য, সড়ক নিরাপত্তা, কৃষি ও শিল্পের শ্রমবাজার, পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা এবং আগামী প্রজন্মের বসবাসযোগ্য বাংলাদেশের।
আজ যদি আমরা দূরদর্শী পরিকল্পনা না করি, আগামী প্রজন্মকে তার আরো বড় মূল্য দিতে হতে পারে। তাই এখনই প্রশ্ন করতে হবে- আর কত নতুন ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা রাস্তায় নামবে? ঢাকার সড়কের ধারণক্ষমতার সীমা কোথায়? চালক ও তাদের পরিবারের নাগরিক সুবিধার পরিকল্পনা কোথায়? ব্যবহৃত লাখ লাখ ব্যাটারির শেষ গন্তব্য কোথায়? কৃষি ও উৎপাদন খাতের শ্রমবাজারে এর প্রভাব কতটা?
উন্নয়নের স্বার্থে, সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে, জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে, পরিবেশের স্বার্থে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এখনই নতুন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার উৎপাদন ও সম্প্রসারণ নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক, কঠোর, মানবিক এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতি গ্রহণের সময় এসেছে।
ঢাকাকে সচল ও বসবাসযোগ্য রাখতে হবে। জীবিকা রক্ষা করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে নগরের শৃঙ্খলা ও দেশের উৎপাদনক্ষমতাও রক্ষা করতে হবে। মানুষের জীবিকার প্রতি মানবিকতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় শৃঙ্খলা- দুটিকে একসঙ্গে নিয়েই সমাধানের পথে যেতে হবে।
লেখক: সহ-অর্থনৈতিক সম্পাদক, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, বিএনপি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









