নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির চাপে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাঙালির প্রিয় ইলিশ মাছ ও গরুর মাংসও এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে। একসময় নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকা এসব পুষ্টিকর খাবার এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে বিলাসিতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) পাবনা জেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
বাজারে বর্তমানে আকারভেদে প্রতি কেজি ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা কিংবা তারও বেশি দামে। বড় আকারের ইলিশ কিনতে গেলে খরচ করতে হচ্ছে আরও বেশি অর্থ। ফলে অধিকাংশ পরিবার এখন বিশেষ দিন, উৎসব কিংবা পারিবারিক আয়োজন ছাড়া ইলিশ কেনার সাহস পাচ্ছে না।
অন্যদিকে গরুর মাংসের দামও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। জেলার বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও নিয়মিত গরুর মাংস কিনতে হিমশিম খাচ্ছে।
পাবনা শহরের বড় বাজারে কেনাকাটা করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী মো. সাইফুল রহমান বলেন, একসময় সপ্তাহে অন্তত একদিন গরুর মাংস কেনা হতো। এখন মাসে একবার কিনতেও অনেক হিসাব-নিকাশ করতে হয়। সংসারের অন্যান্য খরচ মেটানোর পর মাছ-মাংস কেনা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই বাজারের ক্রেতা রেহানা পারভীন বলেন, সন্তানদের আবদার থাকলেও ইলিশ বা গরুর মাংস নিয়মিত কিনে খাওয়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বাজারে গিয়ে দাম শুনলেই অনেক সময় ফিরে আসতে হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বড় ধরনের কষ্টের বিষয়।
দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্রেতাদের আরেকটি অভিযোগ হলো মাংস বিক্রির অনিয়ম। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদের অভিযোগ, মাংসের সঙ্গে অতিরিক্ত হাড়, চর্বি ও অন্যান্য অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এতে প্রকৃত মাংসের পরিমাণ কমে যায় এবং ক্রেতারা কাঙ্ক্ষিত মানের পণ্য পান না।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ, সংরক্ষণ ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত মুনাফার কারণে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ছে। বিশেষ করে জেলে বা খামারি থেকে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছাতে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত থাকায় মূল্য কয়েক ধাপে বেড়ে যায়।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে নজরদারি বাড়ানো এবং ভোক্তা অধিকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। অন্যথায় মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।
ইলিশ মাছ শুধু একটি খাদ্য নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইভাবে গরুর মাংসও বহু পরিবারের পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির কারণে এসব খাবার যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন তা শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকার বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করবে, অস্বাভাবিক মুনাফা ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করবে। মানুষের চাওয়া একটাই—দেশের প্রতিটি পরিবার যেন সাধ্যের মধ্যে মাছ, মাংসসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার কিনে খেতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









