এক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় ছোট ছেলেকে হারিয়েছিলেন। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন শরীয়তপুরের আংগারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক নাজরীন সুলতানা শেলী (৫০)। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সঙ্গে স্বজন, সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যেও বইছে শোকের আবহ।
রবিবার (৩০ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নাজরীন সুলতানা শেলী। তিনি জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহিদ হাসানের স্ত্রী।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সাধারণ জ্বর নিয়ে শরীয়তপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন নাজরীন সুলতানা শেলী। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সেখানে তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার উত্তরা মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দুই দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর বৃহস্পতিবার তাকে ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
আজগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও শেষ পর্যন্ত রবিবার দুপুরে মৃত্যুর কাছে হার মানেন এই শিক্ষক।
মায়ের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলে সাজিদ রাব্বি বলেন, আমার মা অসুস্থ হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার উত্তরা মেডিকেল হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করি। দুই দিন চিকিৎসার পর বৃহস্পতিবার তাকে আজগর আলী হাসপাতালে নিয়ে যাই। তখনো মা অনেকটা সুস্থ ছিলেন। আমার কাছে খেতেও চেয়েছিলেন। এর পরপরই হঠাৎ স্ট্রোক করেন। চিকিৎসকরা তাকে লাইফ সাপোর্টে নেন। অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু মাকে বাঁচাতে পারলাম না।
নাজরীন সুলতানা শেলীর জীবনে এই মৃত্যু যেন পুরোনো ক্ষতকে আবারও রক্তাক্ত করে তুলেছে। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় তার ছোট ছেলে আলবাব রেজা রোহান নিহত হন। সন্তানের অকালমৃত্যুর শোক বুকে নিয়ে পরিবারকে সামলে ওঠার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু বছর না ঘুরতেই সেই মাকেও হারাতে হলো পরিবারকে।
একই পরিবারের দুই প্রিয় সদস্যকে অল্প সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক। শোক ছুঁয়ে গেছে পুরো এলাকাকেও।
আংগারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিৎ সাহা বলেন, “নাজরীন সুলতানা শেলী শুধু একজন দক্ষ শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ ছিলেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি তার আন্তরিকতা ছিল অসাধারণ। তার কাছে শিক্ষার্থীরা সহজেই নিজেদের কথা বলতে পারত। তার এমন মৃত্যু আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”
বিদ্যালয়ের আরেক সহকর্মী বলেন, “নাজরীন আপা আমাদের কাছে শুধু সহকর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন পরিবারের একজনের মতো। বিদ্যালয়ের যেকোনো প্রয়োজনে তিনি আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়াতেন। শিক্ষার্থীদের নিয়েও তার সবসময় আলাদা চিন্তা ছিল। কিছুদিন আগেও তিনি স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আজ তিনি নেই—এটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন। তার চলে যাওয়া আমাদের সবার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে আন্তরিক, দায়িত্বশীল ও মানবিক শিক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন নাজরীন সুলতানা শেলী। তার মৃত্যুতে আংগারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শোক নেমে এসেছে।
স্বজনরা জানান, একদিকে সন্তানের মৃত্যু, অন্যদিকে পরিবারের প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনা—অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুই শোক যেন পরিবারটিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









