মৌলভীবাজারের বড়লেখায় গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার মুন্নির মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বড়লেখা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মুন্নির মৃত্যুকে ঘিরে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে নির্যাতনের পর হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মুন্নির মৃত্যুর কারণ হিসেবে ঝুলে থাকার কারণে শ্বাসরোধ এবং ঘটনাটিকে আত্মহত্যাজনিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, মুন্নির মৃত্যুর ঘটনায় কোনো ধরনের টালবাহানা মেনে নেওয়া হবে না। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে চিকিৎসকের মতামত যেমন বিবেচনায় নিতে হবে, তেমনি পরিবারের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আইন অনুযায়ী তদন্ত সম্পন্ন করার দাবি জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, তদন্তের মাধ্যমে মুন্নির মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট করার পাশাপাশি ঘটনায় কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন বড়লেখা হাজীগঞ্জ বাজার বণিক সমিতির আহ্বায়ক ও সমাজসেবক আব্দুল গনি। সমাজসেবক আব্দুল কাদির পলাশ ও সাবেক ছাত্রনেতা মুস্তাফিজুর রহমান রাজন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
এ সময় বক্তব্য দেন প্রবাসী সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নুরুল ওয়াহিদ, রাজনীতিবিদ ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আহমদ রিয়াজ, বড়লেখা সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফখরুল ইসলাম, বড়লেখা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল হাফিজ ললন, সমাজসেবক খালেদ আহমদ, রবিউল ইসলাম সুহেল, শাহিন আহমদ, সুরমান আহমদ, শিপার আহমদ, সাংবাদিক হাসান শামীম, ফয়ছল আহমদ সাগর, ছাত্রনেতা তানিম আহমদ, আরিফুল ইসলাম প্রমুখ।
মুন্নির পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন তার বাবা মকবুল আলী, মা রেনু বেগম ও ভাই মাছুম আহমদ।
এর আগে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে বড়লেখা থানায় সংবাদ সম্মেলনে মুন্নির ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২১ আগস্ট বিকেল ৫টার দিকে বড়লেখা থানার মুরিরগুল গ্রামে মুন্নির আত্মহত্যার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে বসতবাড়ির টয়লেটের টিনের চালার কাঠের তীরের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। পরে প্রচলিত আইন অনুযায়ী মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
ওসি জানান, মুন্নির বাবা হাজী মকবুল আলী তার মেয়ের মানসিক চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র দেখিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের জন্য পুলিশের কাছে অনুরোধ করেছিলেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে পুলিশ ময়নাতদন্তের প্রয়োজন মনে করে।
পরে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারায় বড়লেখা থানায় অপমৃত্যু মামলা (ইউডি) নম্বর ৩১, তারিখ ২১ আগস্ট ২০২৬, করা হয়। এরপর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানায়, ৩ সেপ্টেম্বর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এতে চিকিৎসক মতামত দেন, ঝুলে থাকার কারণে শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়েছে এবং ঘটনাটি জীবদ্দশায় সংঘটিত আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু।
ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, ‘‘ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে চিকিৎসক আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছেন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ দেওয়া হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
মুন্নির পরিবারের দাবি, গত ২১ আগস্ট শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে তার বিরোধ হয়। একপর্যায়ে তাকে নির্যাতন করা হয়। ওই সময় মুন্নি ভিডিও ও খুদে বার্তার মাধ্যমে তার বাবা-মাকে বিষয়টি জানান বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন।
পরিবারের ভাষ্য, মেয়ের কাছ থেকে এমন খবর পেয়ে তার বাবা স্থানীয় কয়েকজন মুরুব্বির সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি সমাধানের অনুরোধ করেন। পরে একজন মুরব্বি ফোন করে তাকে জানান, বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে।
এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধির পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি মুন্নির বাবাকে শ্বশুরবাড়িতে যেতে বলেন বলে পরিবারের দাবি। সেখানে গিয়ে তিনি বাথরুমের কাঠের বিমের সঙ্গে মেয়ের ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান।
পরিবারের অভিযোগ, মুন্নিকে নির্যাতনের পর হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় মামলা গ্রহণ, জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরে মুন্নির বাবা-মা ও স্বজনেরা বড়লেখা উপজেলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেও একই অভিযোগ করেন। তাদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে।
মুন্নির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা ধরনের বক্তব্য ও প্রচারণা চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রকৃত তথ্য ও আইনগত অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর, অসত্য বা উসকানিমূলক তথ্য প্রচার না করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধ করা হয়েছে।
ময়নাতদন্তে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর কথা বলা হলেও পরিবারের অভিযোগ ও স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নের কারণে বিষয়টি নিয়ে তদন্তের দাবি অব্যাহত রয়েছে। এখন তদন্তে মুন্নির মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা কীভাবে উঠে আসে, সেদিকেই নজর স্থানীয়দের।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









