শ্রেণিকক্ষে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে ঝাঁঝালো গন্ধ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একে একে অসুস্থ হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে অন্তত অসুস্থ ২৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ জনকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পর শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
তবে ঘটনার একদিন পর প্রশাসনের তদন্তে প্রাথমিকভাবে এর কারণ শনাক্ত হয়েছে। বিদ্যালয়ের পাশের ধানখেতে ‘এসিমিক্স’ নামের কীটনাশক স্প্রে করার পর সৃষ্ট বিষাক্ত বাষ্প বাতাসের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে ঢুকার কারণে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার তমরদ্দি ইউনিয়নের জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।
পরদিন মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল। এ সময় পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল টিমের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল থেকে নিয়মিত পাঠদান চলছিল। একপর্যায়ে ষষ্ঠ, সপ্তম ও দশম শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী হঠাৎ মাথা ঘোরা, বমি ভাব ও অস্থিরতা অনুভব করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। একে একে অন্তত ২৫ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে বিদ্যালয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
অসুস্থদের মধ্যে ১৫ জনকে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১৩ জনকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে রাতে তারা বাড়ি ফিরে যায়। মঙ্গলবার সকালে আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা সুস্থ হয়ে আবার বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ক্লাসে অংশ নেয়।
ঘটনার পর প্রথমদিকে শ্রেণিকক্ষে ছড়িয়ে পড়া ঝাঁঝালো গন্ধের উৎস নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে মঙ্গলবার সকালে ইউএনওর নেতৃত্বে তদন্ত দল বিদ্যালয়ের আশপাশ পরিদর্শন করে। এ সময় বিদ্যালয়ের পশ্চিম-উত্তর পাশে একটি ধানখেতে কীটনাশক স্প্রে করার তথ্য পাওয়া যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদ্যালয়ের সীমানার একেবারে পাশে ওই জমিতে কীটনাশক স্প্রে করা হয়েছিল। সেখান থেকে কীটনাশকের বাষ্প বাতাসের সঙ্গে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে। এর প্রভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাথা ঘোরা, বমি ভাব, অস্থিরতা ও চেতনা হারানোর মতো শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউএনও রাসেল ইকবাল বলেন, ‘‘রবিবার ওই জমিতে একজন কৃষক ‘এসিমিক্স’ কীটনাশক স্প্রে করেন। মঙ্গলবার ওই কৃষক তার বাড়িতে থাকা কীটনাশকের বোতল তদন্ত দলের কাছে নিয়ে আসেন। বোতলের গায়ে তীব্র ঘ্রাণ বা সংস্পর্শে মাথা ঘোরা, বমি ভাব, অস্থিরতা ও চেতনা হারানোর মতো প্রতিক্রিয়া হওয়ার সতর্কতা উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনায় কীটনাশকের বোতলসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয়েছে।’’
জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘‘ঘটনার পর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এবং মঙ্গলবার সবাই বিদ্যালয়ে এসেছে। বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে।’’
হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা জানান, অসুস্থ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। পরে তাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে বাড়িতে পাঠানো হয়।
এদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে বিদ্যালয়ের আশপাশে কীটনাশক ব্যবহারে সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।
ইউএনও রাসেল ইকবাল বলেন, ‘‘বিদ্যালয় চলাকালে স্কুলের সীমানাসংলগ্ন জমিতে কোনো ধরনের কীটনাশক স্প্রে করা যাবে না। বিদ্যালয়ের আশপাশে কীটনাশক ব্যবহার করতে হলে শুক্র ও শনিবারের মতো ছুটির দিন বেছে নিতে হবে।’’
প্রশাসনের এই নির্দেশনার পর আপাতত স্বস্তি ফিরেছে জোড়খালী উচ্চবিদ্যালয়ে। তবে বিদ্যালয়ের সীমানার পাশে কৃষিজমিতে কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-অভিভাবকেরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









