তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন প্রতিরোধ, সড়ক ও বেড়িবাঁধ রক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবিতে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার হাজিরহাটে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দারা।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় লঞ্চঘাটসংলগ্ন ভাঙনপ্রবণ এলাকায় এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
কয়েক দিনের ভয়াবহ নদীভাঙনে সড়কের অংশ, বেড়িবাঁধ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ফেলা জিওব্যাগ নদীগর্ভে বিলীন হওয়া এবং প্রায় ২০টি কবর ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত এলাকাবাসী এ কর্মসূচি পালন করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত কয়েক দিন ধরে তেঁতুলিয়া নদীতে পানির চাপ ও স্রোত বাড়তে থাকলেও মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর হাজিরহাট এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। রাত ৮টার দিকে হাজিরহাট লঞ্চঘাটের পশ্চিম-উত্তর পাশে ভাঙন শুরু হয়। তীব্র স্রোতের টানে তীর রক্ষায় পাউবোর ফেলা জিওব্যাগসহ সড়কের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। রাতভর ভাঙন চলার পর বুধবার সকালেও নদীর স্রোত কমেনি। ফলে সড়ক ও বেড়িবাঁধের আরও অংশ ভেঙে নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভাঙনের তীব্রতায় তীর রক্ষায় ফেলা শতাধিক জিওব্যাগ ধসে নদীতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে পাকা সড়কের পিচ ও মাটির অংশও নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় সড়ক ও নদীর সংযোগস্থলে বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙন ছড়িয়ে পড়ায় নদীতীরবর্তী অর্ধশতাধিক বসতঘর ও শতাধিক কবরস্থান ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ইতোমধ্যে স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী প্রায় ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো ঘরবাড়ির মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ঝুঁকিতে থাকা কবরস্থান থেকে কবর খুলে মরদেহ অন্যত্র স্থানান্তর করতে হচ্ছে স্বজনদের। এ পরিস্থিতিতে হাজিরহাট জামে মসজিদ, হাজিরহাট বাজার ও হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পাউবোর নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধের বাকি অংশও নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। এতে আরও বসতবাড়ি, সড়ক, কবরস্থান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দশমিনা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. লুৎফর রহমান বলেন, হাজিরহাটের মানুষ এখন ঘরবাড়ি ও বসতভিটা নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে নদীর ভাঙন যেভাবে বেড়েছে, তাতে রাতের মধ্যেই সড়কের অংশ ও পাউবোর জিওব্যাগ নদীতে চলে গেছে। সকালে ভাঙন আরও বিস্তৃত হয়েছে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, মানুষের বসতভিটার পাশাপাশি কবরস্থানও রক্ষা করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে প্রায় ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্বজনদের ঝুঁকিপূর্ণ কবর থেকে মরদেহ সরিয়ে নিতে হচ্ছে। তিনি দ্রুত সড়ক ও বেড়িবাঁধ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান।

দশমিনা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. ফকরুজ্জামান বাদল বলেন, হাজিরহাটের নদীভাঙন এখন আর শুধু নদীতীরের সমস্যা নয়; এটি মানুষের বসতবাড়ি, যোগাযোগব্যবস্থা, কবরস্থান, মসজিদ ও বাজারকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে। তীব্র স্রোতে সড়ক ও তীররক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জিওব্যাগও নদীতে চলে যাচ্ছে। শুধু জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হবে না। প্রয়োজন স্থায়ী ও টেকসই নদীশাসন কার্যক্রম। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নিয়ম ও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে দ্রুত সড়ক ও বেড়িবাঁধ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি আরও মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
মানববন্ধনে বাংলাদেশ শাসনতন্ত্র আন্দোলনের দশমিনা উপজেলা আহ্বায়ক মো. মজিবুর রহমান প্যাদা, হাজিরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জহিরুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. রুহুল আমিন মোল্লাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধন থেকে হাজিরহাটের ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে সড়ক ও বেড়িবাঁধ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কার, তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় নদীশাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নিয়ম ও নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে দ্রুত ও যথাযথভাবে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান স্থানীয়রা।
দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও বেড়িবাঁধ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টিও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









