ক্যান শুয়ের গল্প পড়তে গেলে প্রথমেই মনে হয়, আমরা এমন একটি পৃথিবীতে ঢুকে পড়েছি যার নিয়মগুলো পরিচিত নয়। এখানে সময় সরল পথে চলে না, মানুষ এক মুহূর্তে নিজের পরিচিত জায়গা হারিয়ে ফেলতে পারে, আর একটি কান, একটি সাপ কিংবা কয়েকটি শামুকও হঠাৎ মানুষের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাস্তবতার ভেতরেই যেন আরেকটি বাস্তবতা লুকিয়ে আছে।
ক্যান শুয়ের ‘মাদার রিভার’ এমনই এক বই। তার ইংরেজি অনুবাদের সংখ্যা এক ডজনেরও বেশি। বিভিন্ন সময়ে নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি প্রেস, হেনরি হল্ট, নিউ ডিরেকশন্স, ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেসসহ নানা প্রকাশনা সংস্থা তার বই প্রকাশ করেছে। তার লেখার প্রশংসা করেছেন রবার্ট কুভার, জন ডার্নিয়েল ও সুসান সন্টাগ। ‘দ্য লাস্ট লাভার’ বইটির জন্য ২০১৫ সালে তিনি বেস্ট ট্রান্সলেটেড বুক অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন।
‘মাদার রিভার’-এ আছে ১৩টি গল্প। গল্পগুলোর ঘটনাগুলো মনে রাখার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে গল্প পড়ার সময় আমাদের ভেতরে যে অনুভূতি তৈরি হয়। আমরা কোথায় আছি, কে কথা বলছে, কী ঘটছে—এসব প্রশ্নের উত্তর বারবার বদলে যায়।

‘মাদার রিভার’ গল্পটি একটি তরুণের বেড়ে ওঠার গল্প। সে জেলে হতে চায়। পরে গোলাকার মানচিত্র তৈরি করার কাজ শেখে। নদী, মাছ, মানুষ—সবকিছু সম্পর্কে তার ধারণা ধীরে ধীরে বদলে যায়। একসময় সে বুঝতে পারে, কত মাছ ধরল সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে যে মানুষ হয়ে উঠছে, সেই হয়ে ওঠাটাই আসল।
ক্যান শুয়ের গল্পে পরিবর্তন খুব ধীরে আসে। প্রথমে আমরা হয়তো তা বুঝতে পারি না। একটি ঘর একই থাকে, অথচ তার ভেতরের মানুষ বদলে যায়। একটি পরিচিত রাস্তা হঠাৎ অপরিচিত মনে হয়। কোনো একটি প্রাণী বারবার চোখে পড়ে এবং তার উপস্থিতি ক্রমে বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে।
‘দ্য গডেস অব শিসুয়াংবান্না’ গল্পে ঝাও নামের একজন মানুষ বারবার কিছু অদ্ভুত কান দেখতে পায়। পোকা, সাপ, শামুক, গোলাপ—সবকিছু যেন তার চারপাশে নিজেদের জীবন নিয়ে উপস্থিত। ঝাও নতুন একটি বহুতল ভবনে চলে যায়। কিন্তু সেখানে গিয়েও তার পুরোনো অভিজ্ঞতাগুলো তাকে ছেড়ে যায় না।
একসময় প্রশ্নটি বদলে যায়। ঝাও কি সত্যিই এসব প্রাণীকে দেখছে, নাকি প্রাণীগুলোই তাকে দেখছে?
ক্যান শুয়ের লেখার শক্তি এখানেই। তিনি পাঠককে একটি নির্দিষ্ট অর্থ দেন না। বরং একটি দৃশ্যের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখেন। আমরা তাকিয়ে থাকি। দৃশ্যটি ধীরে ধীরে বদলে যায়। তারপর বুঝতে পারি, বদলটি হয়তো দৃশ্যে ঘটেনি; ঘটেছে আমাদের চোখের ভেতর।

তার গল্পে হাস্যরসও আছে, কিন্তু সেটি কখনো জোর করে আসে না। অদ্ভুত কোনো পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষ স্বাভাবিকভাবে কথা বলে, কাজ করে, নিজের দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে যায়। এই স্বাভাবিকতার মধ্যেই অস্বাভাবিকতা আরও গভীর হয়ে ওঠে।
‘মাদার রিভার’ পড়ার সময় তাই গল্পের শেষ কোথায়, তা খুঁজে লাভ নেই। বরং দেখতে হয়, গল্পটি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। কখনো তা নদীর কাছে, কখনো শৈশবের কাছে, কখনো এমন এক জায়গায় যেখানে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে, স্বপ্ন ও জাগরণের মধ্যে, স্মৃতি ও বর্তমানের মধ্যে কোনো স্পষ্ট সীমারেখা থাকে না।
ক্যান শুয়ের পৃথিবীতে বাস্তবতা একটি আবদ্ধ ঘর নয়। তার ভেতরে আরও ঘর-দরজা আছে। একটি দরজা খুললে আরেকটি ঘর দেখা যায়। সেই ঘরের ভেতর হয়তো একটি নদী বয়ে যাচ্ছে, একটি সাপ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে, অথবা একটি গোলাপ এমনভাবে ফুটে আছে যেন সে আমাদের সম্পর্কে কিছু জানে।
তার গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পরও সেই পৃথিবী শেষ হয় না। বরং তখনই হয়তো তা আমাদের নিজের পৃথিবীর ভেতর ঢুকে পড়ে।

মাদার রিভার, লেখক: ক্যান শুয়ে, প্রকাশক: ব্ল্যাকস্টোন পাবলিশিং, ইনকরপোরেটেড, ২৫৫ পৃষ্ঠার বইটির দাম ৩৮.১৪ ডলার।
পরিচিতি
ক্যান শুয়ে (Can Xue) সমকালীন চীনা সাহিত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র ও নিরীক্ষাধর্মী লেখক। তার আসল নাম দেং শিয়াওহুয়া। ১৯৫৩ সালে চীনের হুনান প্রদেশের ছাংশায় তার জন্ম। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। পরে তিনি নিজে নিজে সাহিত্য ও দর্শন পড়েন। কাফকা, বোর্হেস, দান্তে ও শেক্সপিয়ারের লেখার প্রভাব তার সাহিত্যে দেখা যায়।
ক্যান শুয়ের লেখায় স্বপ্ন, বাস্তবতা, স্মৃতি ও মানুষের অবচেতন জগত একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়। প্রচলিত গল্প বলার ধরন থেকে বেরিয়ে তিনি মানুষের ভেতরের অদৃশ্য জগৎকে তুলে ধরেছেন। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘ফাইভ স্পাইস স্ট্রিট’ , ‘ভার্টিক্যাল মোশন’, ‘দ্য লাস্ট লাভার’, ‘ফ্রন্টিয়ার’, ‘লাভ ইন দ্য নিউ মিলেনিয়াম’ এবং ‘আই লিভ ইন দ্য স্লামস’।
২০১৫ সালে দ্য লাস্ট লাভার বইয়ের জন্য তিনি বেস্ট ট্রান্সলেটেড বুক এওয়ার্ড পান। তার ‘লাভ ইন দ্য নিউ মিলেনিয়াম’ ও ‘আই লিভ ইন দ্য স্লামস’ আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায়ও স্থান পেয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









