‘গেম অব থ্রোনস’-এর পর হারিয়ে গিয়েছিলেন মেইসি উইলিয়ামস। এখন জীবনকে একটু বেশি উপভোগ করছেন এই অভিনেত্রী। মেইসি উইলিয়ামস জীবনে মাত্র একবার জাদুবিদ্যার সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। একটি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য অডিশন দেওয়ার আগে চরিত্রটি পাওয়ার জন্য তিনি এতটাই মরিয়া ছিলেন যে অনলাইনে একটি জাদুবিদ্যার সাইট থেকে একজন ‘ডাইনি’র সাহায্য নিয়েছিলেন।
হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আমি এতটাই চরিত্রটি চেয়েছিলাম যে একজন ডাইনিকে টাকা দিয়ে বলেছিলাম, যেন সে আমাকে চরিত্রটি পাইয়ে দেয়।’
কাজ হয়নি। সেই ছিল তার জাদুবিদ্যার শেষ চেষ্টা।
তবে এবার পর্দায় সত্যিই জাদু করতে দেখা যাবে তাকে। আসছে ‘প্রেক্টেক্যাল ‘প্র্যাকটিক্যাল ম্যাজিক ২’ ছবিতে। ১৯৯৮ সালের জনপ্রিয় রোমান্টিক কমেডি ‘প্র্যাকটিক্যাল ম্যাজিক টু’-এর এই নতুন ছবিতে মেইসি অভিনয় করেছেন অ্যান্টোনিয়া চরিত্রে। তিনি স্যান্ড্রা বুলকের অভিনীত স্যালি ওওয়েন্সের ছোট মেয়ে।
অনলাইনের সেই ‘ডাইনিকে’ দেওয়া টাকাও অবশ্য ফেরত পাননি মেইসি। টাকার পরিমাণ ছিল খুব বেশি নয়। তাই এখন বিষয়টি নিয়ে তার নিজেরই হাসি পায়।

ছোট বয়সেই বড় হয়ে যাওয়া
২৯ বছর বয়সী মেইসি উইলিয়ামসকে এখনো অনেকে ‘গেম অব থ্রোনস’-এর আরিয়া স্টার্ক হিসেবেই সবচেয়ে বেশি মনে রাখেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে এই চরিত্রে অভিনয় করে তিনি রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
আরিয়া ছিল ছোট্ট এক মেয়ে, কিন্তু তার ভেতরে ছিল ভয়ংকর সাহস। পরে সে হয়ে ওঠে দক্ষ ঘাতক। মেইসির অভিনয় চরিত্রটিকে এতটাই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল যে আরিয়া স্টার্ক তার নিজের পরিচয়ের সঙ্গে প্রায় মিশে যায়। কিন্তু ‘গেম অব থ্রোনস’ শেষ হওয়ার পরের সময়টা তার জন্য সহজ ছিল না।
সাত বছর ধরে তিনি নানা ধরনের কাজ করেছেন। ‘দ্য নিউ মিউট্যান্টস’-এ অভিনয় করেছেন, ড্যানি বয়েলের ‘পিস্তল’ সিরিজে পাঙ্ক সংগীতের আইকন জর্ডানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘দ্য নিউ লুক’-এ তাকে দেখা গেছে ফ্যাশন দুনিয়ার দুই কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ান ডিওর ও কোকো শ্যানেলের গল্পে।
নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও শুরু করেছেন। বন্ধুদের সঙ্গে চালু করেছেন ‘ফ্র্যাঙ্ক ফিল্ম ক্লাব’ পডকাস্ট। তবু এত কাজের মাঝেও একটা সময় তিনি বুঝতে পারছিলেন না, সামনে কী করবেন। তাই এখন তিনি এমন কাজ খুঁজছেন, যেখানে একটু আনন্দ আছে, একটু হালকা হওয়ার সুযোগ আছে।
‘বিশের প্রথম অর্ধেকটা ছিল নরকের মতো,’ তিনি বলেন। তারপর যেন ধীরে ধীরে জীবনকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করেছেন তিনি।
স্যান্ড্রা বুলক ও নিকোল কিডম্যানের কাছ থেকে শিক্ষা
‘প্র্যাকটিক্যাল ম্যাজিক ২’ তাকে সেই আনন্দেরই একটি সুযোগ দিয়েছে। ছবিটির দুই প্রধান তারকা স্যান্ড্রা বুলক ও নিকোল কিডম্যান। তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ মেইসির কাছে ছিল প্রায় স্বপ্নের মতো।
‘ওঁরা এমন এক সময়ের সত্যিকারের সিনেমা তারকা, যে সময়টা এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে,’ মেইসি বলেন। ‘আমি প্রথম যখন ছবিতে যোগ দিই, তাদের আমার কাছে প্রায় অন্য জগতের মানুষ মনে হয়েছিল।’
প্রথমবার তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ছবির পাঠ-অনুষ্ঠানে। পরে সেদিনই মেইসি গ্লাস্টনবেরি উৎসবে যাওয়ার পথে গাড়িতে বসে আনন্দে প্রায় চিৎকার করে ফেলেছিলেন।
শুটিংয়ের ফাঁকে অবশ্য দুই অভিজ্ঞ অভিনেত্রীর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো অভিনয়জগত নিয়ে ছিল না। বরং ছিল জীবন নিয়ে। একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখা সব সময় সম্ভব নয়। মেইসি হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমরা সবাই এ নিয়ে একমত হয়েছিলাম।’

নিজের পরিবার, নিজের দূরত্ব
ছবিতে মেইসি ও জোয়ি কিং দুই বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাদের সব সময় একসঙ্গে দেখা যায়—মায়ের বাড়িতে একই বিছানায় বসে গল্প করছে, যেন দুই বোন নয়, দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাস্তব জীবনেও মেইসির তিন ভাইবোন। তাদের মধ্যে একজন বোন তার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়।
‘আমরা একসঙ্গে থাকলে মনে হয়, যেন মাঝখানে কোনো সময়ই কেটে যায়নি,’ বলেন তিনি। ‘তবে আমরা প্রতিদিন ফোন করি না।’
এখন তাদের সম্পর্কের বড় একটি অংশ তৈরি হয়েছে পরিবারের শিশুদের ঘিরে। মেইসি তার ভাগনে-ভাগনিদের নিয়ে ক্যাম্পিংয়ে যান। ছোটবেলায় একসঙ্গে পার্টি করার সুযোগও তাদের হয়নি। কারণ, মেইসির তখন ‘গেম অব থ্রোনস’ নিয়ে ব্যস্ততা। বেশির ভাগ সময় তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। একসময় নিজের বাড়িও ছেড়ে দিয়েছিলেন।
স্কুলের মঞ্চ থেকে আরিয়া স্টার্ক
অভিনয়ে মেইসির যাত্রাও বেশ অদ্ভুতভাবে শুরু হয়েছিল। স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে তিনি গায়িকা শ্যারন অসবোর্নের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তার অভিনয় দেখে এক বন্ধুর মা মেইসির মাকে বলেছিলেন, মেয়েটিকে অভিনয়ের ক্লাসে দেওয়া উচিত।
সেখান থেকেই অভিনয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু। তারপর খুব দ্রুত সবকিছু বদলে গেল। মাধ্যমিক স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার আগেই ‘গেম অব থ্রোনস’-এ অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে গেলেন তিনি। সাফল্য এত দ্রুত এসেছিল যে মেইসির কাছে মনে হয়েছিল, অভিনয়ের জগতে বুঝি সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায়।
‘আমি ভাবতাম, যা চাইবে তাই পাওয়া যাবে। এই তো, এক মুহূর্তে,’ বলেন তিনি।
তার এই সরল বিশ্বাসই হয়তো তাকে সাহসী করে তুলেছিল। বড় কোনো ভয় বা ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা তখনও তাকে থামিয়ে দেয়নি। ‘ছোটবেলায় কেউ আমাকে ভেঙে দেয়নি,’ তিনি বলেন। ‘আমার মা না, শিক্ষকরা না, এমনকি অভিনয়ের জগতও না।’
তবে তিনি এটাও বুঝেছেন, প্রতিভা থাকলেই সাফল্য আসে না। অনেক মানুষের প্রতিভা থাকে, কিন্তু ১২ বছর বয়সে তাদের কোনো বিশাল টেলিভিশন সিরিজে অভিনয়ের সুযোগ আসে না।
‘আমি ভয় আর রাগকে খুব ভালোভাবে বুঝতাম’
মেইসির জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের কথা উঠলে তার স্বর বদলে যায়। ব্রিস্টল ও সমারসেটের মধ্যে তার শৈশব কেটেছে। পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্কের কিছু বিষয় নিয়ে তিনি এখনো খুব বেশি কথা বলতে চান না। তিনি শুধু বলেন, ছোটবেলায় তার মা, ভাইবোন ও খালার সঙ্গে অনেকটা সময় কাটত। তার খালা শিশুদের দেখাশোনার কাজ করতেন। তাই বাড়িতে সব সময় অনেক শিশু থাকত।
‘আমার জীবন ছিল প্রাণবন্ত, দুষ্টুমি আর খেলায় ভরা,’ বলেন তিনি। কিন্তু সেই আনন্দের আড়ালে ভয়ও ছিল। ‘ছোটবেলার আমাকে যদি আজ কিছু বলতে পারতাম, বলতাম—ভয় পেয়ো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার জীবন ঠিক পথে যাবে।’

মেইসি বলেন, ছোটবেলার ভয় বহু বছর তার জীবনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। তিনি খুব অল্প বয়স থেকেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। হয়তো নিজের জীবনকে অন্যরকম করার তাগিদ থেকেই সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।
২০২২ সালে এক পডকাস্টে তিনি তার শৈশবের কঠিন সময়ের কিছু কথা বলেছিলেন। তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছিল যখন তিনি খুব ছোট। বাবার সঙ্গে তার সম্পর্কও ছিল গভীরভাবে কষ্টের। তিনি জানিয়েছিলেন, যত দূর মনে পড়ে, ঘুমের সমস্যাও তার ছিল। একবার স্কুলের একজন শিক্ষক বুঝতে পেরেছিলেন যে মেইসি ভালো নেই। শিক্ষক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সকালে তিনি নাশতা করেন কি না।
মেইসি বলেছিলেন, করেন না। তখন তার বয়স মাত্র আট। শিক্ষক তার মাকে বিষয়টি জানান। মেইসি পরে বলেছিলেন, তিনি অন্য শিশুদের দিকে তাকিয়ে ভাবতেন—তারা কেন তার মতো ভয় বা কষ্ট অনুভব করছে না? আনন্দই বা তার জীবনে কখন আসবে?
এখন একটু আনন্দের সময়
আজ সেই ছোট্ট মেয়েটি ২৯ বছরের নারী। জীবনের অনেক কঠিন পথ পেরিয়ে তিনি এখন নিজের জন্য অন্যরকম একটা জীবন তৈরি করতে চাইছেন। ‘গেম অব থ্রোনস’ তাকে খ্যাতি দিয়েছিল। কিন্তু সেই খ্যাতির সঙ্গে এসেছিল বড় দায়িত্ব, চাপ এবং নিজের পরিচয় নিয়ে নানা প্রশ্ন।
এখন তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা করছেন, পডকাস্ট করছেন, নতুন ধরনের চরিত্র বেছে নিচ্ছেন। এমনকি জাদুবিদ্যার গল্পের ছবিতেও অভিনয় করছেন।
জীবন সম্পর্কে তার দৃষ্টিও বদলেছে। আগে তিনি মহাবিশ্বের নানা সংকেত খুঁজতেন। কোনো ঘটনা ঘটলে ভাবতেন, নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো অর্থ আছে। এখন তিনি একটু বেশি সতর্ক। হয়তো সবকিছুর পেছনে কোনো রহস্য নেই। অনেক সময় একটি ভালো ঘটনা শুধু একটি ভালো ঘটনাই। এই সরল উপলব্ধির মধ্যেই যেন মেইসি উইলিয়ামসের নতুন জীবন।
আরিয়া স্টার্কের মতো নয়—এবার তিনি নিজের জীবনটাকেই নিজের মতো করে লিখতে চাইছেন। একসময় যে মেয়েটি পর্দায় বাঁচার জন্য লড়েছিল, সে এখন বাস্তব জীবনে একটু আনন্দের জন্য জায়গা তৈরি করছে।
হয়তো এটাই তার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









