মাদারীপুর ১ আসনে রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যাচ্ছে। আওয়ামীলীগ অধ্যুষিত মাদারীপুর ১ আসনের শিবচরে টানা ৩৫ বছর শাসন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য। আওয়ামীলীগ এই আসনে বিএনপিকে সমর্থন দিলেও বিজয়ী হতে পারেনি বিএনপি। টানা ৩৫ বছরের আওয়ামীদুর্গে এমপি নির্বাচতি হলেন হাজী শরিয়তউল্লাহ(র.) এর সপ্তম পুরুষ পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা।
মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা পদ্মা-আড়িয়াল খাঁ বেষ্টিত ঐতিহাসিক এক জনপদ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি এই আসনে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রতিটি সংসদ নির্বাচনেই আওয়ামীলীগের নিরঙ্কুশ বিজয় ছিল এখানে। আওয়ামীলীগের বিগত টানা ১৫ বছরের শাসনামলে উপজেলার জনসাধারণ এক প্রকার আওয়ামীলীগ এর বাইরে কিছু ভাবতে সুযোগ পেতো না। বা ক্ষমতার প্রভাবে সাধারণ মানুষের 'পরিবর্তন' নিয়ে ভাবার সুযোগও ছিল না। তবে ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বদলে গেলো পুরো চিত্র। আওয়ামীলীগ বিহীন নির্বাচনে বিএনপি ভেবেই নিয়েছিল, তাদের বিজয় সুনিশ্চিত এই আসনে! তবে শেষ সময়ে চমকে দিলো পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হয়ে ৩৫ বছরের আওয়ামী দূর্গ ভাঙলেন তিনি!
ইতিহাস অনুযায়ী, মাদারীপুর জেলার শিবচরে হানজালার পূর্বপূরুষদের মর্যাদা এবং গ্রহণযোগ্যতা অনন্য। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, নীলকর ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তার পূর্বপুরুষ হাজী শরিয়তউল্লাহ(র.)। ১৮১৮ থেকে ১৮২০ সালের দিকে সামাজিক-ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন হিসেবে ফরায়েজী আন্দোলন সূচিত হয়। তৎকালীন সময়ে এই আন্দোলন জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক-শ্রমিকদের একটি শক্তিশালী আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। যে আন্দোলনের সূচনা হয় হাজী শরিয়তউল্লাহ(র.) এর হাতে। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র দুদু মিয়া এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যান। তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলে ধর্মীয় সংস্কার হিসেবে ইসলাম প্রচার থেকে শুরু করে ব্রিটিশ নীলকর, জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন হাজী শরিয়তউল্লাহ এবং তার ফরায়েজী আন্দোলন। ওই সময় থেকেই মাদারীপুরের শিবচরে প্রসিদ্ধ পরিবার হিসেবে সমাদৃত তার বংশধর। হাজী শরিয়ত উল্লাহ (র.) এর সপ্তম পুরুষ পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিক্সা প্রতীকে পোস্টাল ব্যালটে এগিয়ে বিজয়ী হন। তবে ১০২ টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ভোটে বিএনপি প্রার্থী থেকে মাত্র ৭৮০ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন। পোস্টাল ব্যালটে ১৩৯৮ ভোট পেয়ে এগিয়ে যান তিনি।
ভোটারদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে,'বিগত নির্বাচনে কেন্দ্রে আওয়ামীলীগের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। অনেকের ভোট, কেন্দ্রে যাওয়ার আগেই হয়ে গেছে। এবারের নির্বাচন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাছাড়া জুলাই বিপ্লব, আওয়ামী শাসনের অবসান, এই উপজেলায় বিএনপিতে নানা বিরোধ, মতভেদ ইত্যাদি কারণে তৃণমূলের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যোগ্য প্রার্থিতা নিয়ে ছিল নানান প্রশ্ন। ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে বাহাদুরপুর পীর মঞ্জিলের বংশধর নির্বাচনে আসায় সাধারণ ভোটাররা 'মনে মনে' প্রার্থী আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। একদিকে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কর্মী-সমর্থক এবং হাজী শরিয়তউল্লাহ (র.) এর বংশধরদের প্রতি এই অঞ্চলের মানুষের আলাদা দূর্বলতাও রয়েছে। তাদের ভক্তবৃন্দও অসংখ্য। সব মিলিয়ে যোগ্য প্রার্থী বিবেচনায় অসংখ্য ভোটার 'নিরবে' তাকে ভোট দিয়েছেন।'
ভোটাররা আরও জানান,'ইসলামিক চিন্তাধারা এবং হানজালার সামাজিক কার্যক্রম মানুষকে নাড়া দিয়েছে। গ্রামের নারীরা একচেটিয়া তাকে ভোট দিয়েছে। এই কারণেই বিএনপি থেকে তার ভোটের ব্যবধান খুবই সামান্য ছিল। অন্যদিকে প্রবাসীরা একচেটিয়া ভোট দেয়ায় তিনি পোস্টাল ব্যালটে এগিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
উপজেলা বিএনপির একাধিক সূত্র দাবি করছে,'শেষ সময়ে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী-সমর্থকেরা বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে যেভাবে ভোট দেয়ার কথা ছিল, ততটা ভোট তারা দেননি। বিএনপির মধ্যকার রেশারেশিতেও ভোট ছুটে গেছে। কমপক্ষে ৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিএনপির বিজয়ের হিসাব-নিকাশ করেছিলেন দলের নেতাকর্মীরা! নতুন ও তরুণ ভোটারদের বিপুল সংখ্যক ভোট রিক্সা প্রতীকে পড়েছে বলেও মনে করেন অনেকে।'
সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা বলেন,'শিবচরের মানুষ আমাদের যেভাবে সাড়া দিয়েছে। ভালোবাসা দিয়েছে, কিভাবে তা প্রকাশ করবো সেই ভাষা নাই! আমি কোন দলের এমপি হবো না, আমি গোটা শিবচরের এমপি হবো। আমরা ইনসাফের শিবচর গড়ে তুলতে চাই।'
তিনি আরও বলেন,'নির্বাচনের এই যাত্রায় আমার পথকে যারা রুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, আমাকে সামনে পেছনে ক্ষতি করতে চেয়েছিলেন, এমন কেউ থাকলে আমি আজ তাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম। আমার কারো প্রতি কোন অভিযোগ নাই। দুঃখ নাই, কষ্ট নাই।'
উল্লেখ্য, মাদারীপুর ১ আসনের শিবচরে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা রিক্সা প্রতীকে পেয়েছেন ৬৪৯০৯ ভোট পেয়ে বেসরকারি ভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী নাদিরা আক্তার মিঠু চৌধুরী পেয়েছেন ৬৪৫২৪ ভোট।
কাওছার আল হাবীব/এদিন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









