কীর্তিনাশা পদ্মা যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে তার চেনা রূপ। শান্ত, নিরীহ নদীটি এখন ফুঁসে উঠছে উজানের ঢলে। প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ছে পানি, আর তার সঙ্গে বাড়ছে চরাঞ্চলের মানুষের শঙ্কা। নদীর বুক ছাপিয়ে পানি ঢুকে পড়ছে জনপদে। ডুবে যাচ্ছে চরের পথ, উঠান, ঘরবাড়ি ও একসময়ের বিনোদনস্থল। পানিবন্দি মানুষের চোখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা—কখন থামবে এই জলস্রোত? রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি ক্রমেই বিপৎসীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ দশমিক ৩০ মিটার। অথচ এই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি।
পানি বাড়তে থাকায় নদীর দক্ষিণ তীরের চরখিদিরপুর, খানপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিম্নভূমি ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। পানির সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। অনেক পরিবার হয়ে পড়েছে পানিবন্দি। কোথাও খাবারের সংকট, কোথাও বিশুদ্ধ পানির হাহাকার। নদীর জল যত বাড়ছে, ততই যেন ছোট হয়ে আসছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, পদ্মার পানি বাড়লেও এখন পর্যন্ত রাজশাহী শহররক্ষা বাঁধে কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়নি। তবে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বাঁধের কোনো স্থানে ঝুঁকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের মিটারগেজ রিডার এনামুল হক বলেন, ‘এখনো পদ্মার পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে নদীর দক্ষিণ তীরের চরাঞ্চলগুলোতে পানি উঠতে শুরু করেছে।’
পানির বাড়ার হিসাবটিও যেন উৎকণ্ঠার গল্প বলছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ১৫ মিটার। শুক্রবার সকাল ৯টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ২০ মিটারে। আর শনিবার সকাল ৯টায় আরও বেড়ে পৌঁছে ১৭ দশমিক ৩০ মিটারে।
পাউবো সূত্রে জানা যায়, উজানের ঢলে প্রায় ১০ দিন ধরে পদ্মায় পানি বাড়ছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ০৫ মিটার। মাত্র তিন ঘণ্টা পর দুপুর ৩টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ১২ মিটারে। অর্থাৎ মাত্র তিন ঘণ্টায় পানি বেড়েছিল ৭ সেন্টিমিটার। এরপরও থামেনি পানির ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা।

রাজশাহী শহরের বিপরীত পাশে ভারত সীমান্তঘেঁষা চরখিদিরপুর ও খানপুরের বেশিরভাগ এলাকা এখন পানির নিচে। যে চরে কিছুদিন আগেও মানুষের কোলাহল ছিল, যেখানে গড়ে উঠেছিল বিনোদনের ছোট্ট এক ঠিকানা, আজ সেখানে কেবল পানির বিস্তার।
চরখিদিরপুরের বাসিন্দা ইয়াসির আলী বলেন, “গত সপ্তাহ থেকেই নদীতে পানি বাড়ছে। আগে এদিকে মিডল চর ছিল। সেখানে বিনোদন স্পটও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ৩-৪ দিনের ব্যবধানে সব ডুবে গেছে।”
তার কথায় যেন ফুটে ওঠে নদীর এক নির্মম পরিবর্তনের ছবি—কয়েক দিনের ব্যবধানেই হারিয়ে গেছে চেনা ভূখণ্ড, ডুবে গেছে মানুষের আনন্দের জায়গা। রাহেমা বেগমের কণ্ঠেও উদ্বেগের ছাপ। তিনি বলেন, “পানি বেড়ে যাওয়ায় আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আমরা বর্তমানে খুবই কষ্টে দিন পার করছি। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে আমাদের জন্য সমস্যা।”
শুধু চরাঞ্চল নয়, পদ্মাবেষ্টিত নগরীর গুড়িপাড়া এলাকার নিম্নাঞ্চলেও জমেছে পানি। কোথাও উঠানে হাঁটুসমান জল, কোথাও নিচু ঘরের মেঝেতে ঢুকে পড়েছে নদীর পানি। মানুষের ঘর যেন ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে পানির সঙ্গে বসবাসের এক অনিচ্ছুক ঠিকানা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক বাড়ির আঙিনায় হাঁটুসমান পানি জমে আছে। নিচু ঘরের মেঝেতেও পানি চলে এসেছে। ফলে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এরই মধ্যে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দি মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিতরণ করা হচ্ছে ত্রাণসামগ্রী। গত বুধবার আশ্রিত পানিবন্দি মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দুপুরের খাবারেরও ব্যবস্থা করেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, “চর খিদিরপুর ও মিডল চরে পানি ওঠায় প্রায় ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে প্রায় ২৫ ধরনের পণ্য রয়েছে।”
বন্যার পানির সঙ্গে আরেকটি বিপদ এসে দাঁড়ায় মানুষের দরজায়—রোগবালাই। সেই আশঙ্কা মাথায় রেখে দুর্গত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চর, মাঝারচরসহ তিনটি স্থানে মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। সেখানে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঠেকাতে।
পদ্মার পানি বাড়ছে। নদীর বুক থেকে জল উঠে আসছে মানুষের উঠানে। কোথাও ডুবে যাচ্ছে পথ, কোথাও ঘর। কিন্তু এই মানুষেরা এখনও তাকিয়ে আছেন নদীর দিকে—হয়তো পানি নামবে, আবার জেগে উঠবে চর, ফিরবে তাদের স্বাভাবিক জীবন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









