সাহিত্য যখন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের সঙ্গে মানুষের, সময়ের সঙ্গে সময়ের এবং প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পের সেতুবন্ধন তৈরি করে, তখন একটি উৎসব হয়ে ওঠে জীবনেরই আরেক পাঠ। এমন আবহেই মৌলভীবাজারে অনুষ্ঠিত হলো দুই দিনব্যাপী ‘স্বনন সাহিত্য উৎসব–২০২৬’। উৎসবের প্রথম দিনে কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য কথাসাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু এবং লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে কবি ও ‘অগ্নিশিখা’-র সম্পাদক সুমন বনিককে দেওয়া হয়েছে ‘স্বনন সাহিত্য পুরস্কার–২০২৬’।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) মৌলভীবাজার পৌরসভা মিলনায়তনে উৎসবের প্রথম দিনে তাদের হাতে ক্রেস্ট, মানপত্র ও অর্থমূল্যের প্রাইজবন্ড তুলে দেওয়া হয়। শিল্পকলা একাডেমির সচিব ও কবি জাকির জাফরান প্রধান অতিথি এবং কবি ও গবেষক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ উদ্বোধক হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা। এরপর কবি, লেখক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের অংশগ্রহণে বের হয় আনন্দ শোভাযাত্রা। উৎসব প্রাঙ্গণে তখন যেন মিলেছিল শব্দ, স্মৃতি ও মানুষের এক আনন্দময় সমাবেশ।
উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন ‘স্বনন’-এর সম্পাদক কবি সুনীল শৈশব। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি কামরুল বাহার আরিফ, কবি কথা সাহিত্যিক, জলদী সম্পাদক নাহিদা আশরাফী।
ডাঃ অঞ্জন ভৌমিক, ডাঃ বিনেন্দু ভৌমিক, আহমদ সিরাজ, লোকগবেষক।
শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন, সৈয়দ মুজিবুর রহমান, চিকিৎসক ওবায়েদ বাপ্পি, এম এ আহাদ, মজিবুর রহমান রঞ্জু, আইনজীবী মিজানুর রহমান, আইনজীবী বিশ্বজিৎ ঘোষ ও নুরুল ইসলাম। পর্বটি সঞ্চালনা করেন নন্দিতা দেব।
উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাম্প্রতিক লিটলম্যাগাজিন আন্দোলন’ শীর্ষক সেমিনার। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও সাহিত্যকর্মীরা এতে অংশ নেন। আলোচনায় উঠে আসে ছোটকাগজের ঐতিহ্য, বর্তমান বাস্তবতা, সংকট, সম্ভাবনা এবং বিকল্প সাহিত্যচর্চায় লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকার নানা দিক।
তৃতীয় পর্বে ছিল কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ। কবিদের স্বর ও উচ্চারণে কবিতা পায় সরাসরি শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছানোর এক ভিন্ন মাত্রা।
এরপর অনুষ্ঠিত হয় ‘সমকালীন সাহিত্য, শিল্পচেতনা ও সিলেটের সাহিত্য’ শীর্ষক আলোচনা। এতে সভাপতিত্ব করেন ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ। মুখ্য আলোচক ছিলেন কবি-প্রাবন্ধিক ও ‘লোকবৃত্ত’-এর সম্পাদক স্বপন নাথ। সমকালীন সাহিত্য, শিল্পের নন্দনচেতনা এবং সিলেটের নিজস্ব সাহিত্য-ঐতিহ্য ও বর্তমান প্রবণতা নিয়ে তাঁর আলোচনা শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ সাড়া জাগায়। উৎসবের অন্যতম উপভোগ্য ও প্রাণবন্ত পর্ব হয়ে ওঠে এটি।
সন্ধ্যা সাতটায় শুরু হয় দিনের শেষ পর্ব। উন্মোচিত হয় ‘স্বনন’-এর সপ্তম সংখ্যা—এবারের বিশেষ ‘চা সংখ্যা’। চা-শিল্পের ইতিহাস, চা-শ্রমিকের জীবন, সংগ্রাম, সংস্কৃতি এবং মৌলভীবাজার-সিলেট অঞ্চলের সঙ্গে চায়ের দীর্ঘ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে সংখ্যাটি। দীর্ঘ প্রস্তুতি, অনুসন্ধান, সম্পাদনা ও প্রকাশনার শ্রমে তৈরি এই বিশেষ সংখ্যাটি ‘স্বনন’-এর প্রকাশনা-যাত্রায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
এরপর ছিল শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ। শিশুর তুলিতে রঙ ও রেখার যে নিজস্ব পৃথিবী তৈরি হয়, সেই পৃথিবীকেও উৎসবের মূল স্রোতের সঙ্গে যুক্ত করে নেয় ‘স্বনন’।
সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্বনন সাহিত্য উৎসব–২০২৬’ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি ও আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে আকমল হোসেন নিপু ও সুমন বনিককে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মানিত করা হয়। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট, মানপত্র ও অর্থমূল্যের প্রাইজবন্ড। সম্মাননা পর্ব সঞ্চালনা করেন কবি মুজাহিদ আহমদ।
প্রথম দিনের আয়োজন শেষ হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। এতে সংগীত পরিবেশন করে মৌলভীবাজারের জনপ্রিয় গানের দল ‘পিঞ্জিরা’।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন ছিল শনিবার কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে আয়োজন করা হয় শিল্প ও প্রকৃতিভ্রমণের। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত অতিথি এবং স্থানীয় সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে আয়োজকেরা যান বড়লেখার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণ মাধবকুণ্ডে। ঝরনার জলধারার পাশে কবিতা, গান, আবৃত্তি ও নানা পরিবেশনায় প্রকৃতি ও শিল্প একাকার হয়ে ওঠে। দিনব্যাপী এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুই দিনের উৎসব।
দীর্ঘদিন ধরে ছোটকাগজ ‘স্বনন’ মৌলভীবাজারের সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিসরে নিজস্ব একটি জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবারের উৎসবও ছিল সাহিত্য, শিল্প, প্রকৃতি ও মানুষের মিলনের এক ব্যতিক্রমী আয়োজন।
মৌলভীবাজারের সাংস্কৃতিক পরিসরে তাই ‘স্বনন সাহিত্য উৎসব’ এখন আর নিছক একটি বার্ষিক আয়োজন নয়; এটি হয়ে উঠেছে সাহিত্যপ্রেমী মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা ও অপেক্ষার একটি নাম। শব্দের এই উৎসব শেষ হয়েছে, কিন্তু তার রেশ থেকে গেছে কবিতার মতো—মৌলভীবাজারের মানুষের মনে, স্মৃতিতে এবং আগামী দিনের অপেক্ষায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









