চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নে বহুল আলোচিত মোহাম্মদ করিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার মোঃ মাসুদ আলমের সার্বিক দিক-নির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) নিবিড় তদন্ত ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দেশীয় এলজি, এয়ার গান, রক্তমাখা চাপাতিসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে রাউজান থানাধীন উরকিরচর ইউনিয়নের কেরানিহাট বাজারে মোহাম্মদ করিমকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। জানা যায়, সিএনজিযোগে আসা একদল সন্ত্রাসী করিমকে ঘিরে ধরে গুলি করে এবং পরবর্তীতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথা ও ঘাড়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে সিএনজিযোগে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
ঘটনার পর পর চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এবং পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন।
নিহত মোহাম্মদ করিম রাউজান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমান বাজার এলাকায় বসবাস করতেন। তার বিরুদ্ধে চুরি, মাদক, ডাকাতি, ছিনতাইসহ ১০টি মামলা রয়েছে।
তদন্তে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১০দিন আগে রাউজান উপজেলার পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের জনৈক পারভেজের মামা আজগরের বাড়ির উঠোনে থেকে একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। পারভেজ ওই চুরির ঘটনায় করিমকে সন্দেহ করে মোটরসাইকেলটি ফেরত দেওয়ার জন্য তাকে চাপ দেয়। করিম মোটরসাইকেলটি চুরি করেনি বলে জানালে পারভেজ তার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে ঘটনার দিন সন্ধ্যার দিকে পারভেজ তার নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে কৌশলে করিমকে রাউজানের কেরানিহাট বাজার এলাকায় ডেকে নিয়ে আসে। সেখানে পারভেজসহ অন্যান্য আসামি পরস্পর যোগসাজশে করিমকে প্রথমে গুলি করে এবং পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।
গোয়েন্দা পুলিশ স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদপূর্বক তথ্য সংগ্রহ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করে। প্রথমে সিএমপির চাঁদগাঁও থানাধীন কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকা থেকে সৈয়দ মোহাম্মদ শুক্কুর (২৭) ও মো. জাবেদ (২৮)-কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র ও কার্তুজ রাউজান থানাধীন পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের মগদাই এলাকায় পলাতক আসামি পারভেজের পরিত্যক্ত গরুর ফার্মে রাখা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত শুক্কুর ও জাবেদকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে পারভেজের পরিত্যক্ত গরুর ফার্মে অভিযান পরিচালনা করে আসামিদের দেখানো এবং তাদের নিজ হাতে বের করে দেওয়ার ভিত্তিতে ফার্মের ভিতরে সিমেন্টের তৈরি গামলার মধ্যে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার এবং পরবর্তীতে হাটহাজারী থানাধীন দক্ষিণ মাদার্শা এলাকা থেকে মো. সেলিম (৫০) ও মো. আলামিন (২৯)-কে গ্রেপ্তার করা হয়।
করিম হত্যাকান্ডের ঘটনায় উদ্ধারকৃত আলামতের মধ্যে রয়েছে, একটি লোহার তৈরি দেশীয় এলজি, একটি দেশীয় তৈরি এয়ার গান, ২ রাউন্ড ১২ বোরের সীসা কার্তুজ, একটি চাপাতি এবং একটি লোহার গ্রিল কাটার।
হত্যাকান্ডে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তারকৃত চার আসামিরা হলেন, রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের মো. সেলিম (৫০), একই ইউনিয়নের সৈয়দ মোহাম্মদ শুক্কুর (২৭), মো. জাবেদ (২৮) ও মো. আলামিন (২৯)। তন্মধ্যে মো. সেলিমের বিরুদ্ধে ১টি চুরির মামলা, মো. জাবেদের বিরুদ্ধে ১টি অপহরণ মামলা এবং মো. আলামিনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকের ২টি মামলা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম আরো জানান, থানা রেকর্ডপত্র ও সিডিএমএস যাচাই করে পলাতক আসামি মো. পারভেজ (৪৫)-এর বিরুদ্ধে রাউজান থানাসহ বিভিন্ন থানায় হত্যা, ডাকাতি, অস্ত্র, নারী ও শিশু নির্যাতন, বিস্ফোরক এবং অন্যান্য অপরাধে একাধিক মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে পূর্বের মামলাগুলোর মধ্যে হত্যা, ডাকাতি ও অস্ত্র আইনের মামলাও রয়েছে।
মামলার অন্যতম পলাতক আসামি পারভেজসহ অন্যান্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের এবং পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









