অনেকদিন পর আবারও মোশায়রার আসরে মাতলেন সৈয়দপুরের দর্শক-শ্রোতারা। বাংলা-উর্দু কবিদের কবিতা, গজল আর প্রাণবন্ত পরিবেশনায় শনিবার রাতে মুখর হয়ে ওঠে শহরের বাঁশবাড়ি এলাকা। গভীর রাত পর্যন্ত চলে কবিতা পাঠের ওই আসর। স্থানীয় উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মোশায়রার (কবিতা পাঠের আসর) এমন আয়োজন যেন পুরোনো দিনের স্মৃতিকেই আবার ফিরিয়ে আনে।
মোশায়রা মূলত কবিতা পাঠের আসর। এতে কবিরা নিজস্ব রচনার কবিতা, গজলসহ বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যকর্ম পাঠ করেন কবিরা। সমসাময়িক বিষয়, সামাজিক বাস্তবতা, ধর্মীয় অনুভূতি, হাস্যরস ও নানা জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় উঠে আসে এসব কবিতার পঙ্কিতে। তাই ব্যস্ত জীবনের নানা ক্লান্তিরর মাঝে সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্বাদ নিতে মোশায়রার আসরে ছুটে আসেন দূর-দূরান্তের মানুষও।
শনিবার রাতে সৈয়দপুর শহরের বাঁশবাড়ি এলাকার উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন স্ট্যান্ডেড পিপলস জেনারেল রিহ্যাবিলিটেশন কমিটি (এসপিজিআরসি) কার্যালয়ে এ মোশায়রার আয়োজন করা হয়। এতে সৈয়দপুরের প্রখ্যাত উর্দু কবিরা অংশ নেন এবং নিজ নিজ রচিত কবিতা পাঠ করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এসপিজিআরসি সৈয়দপুরের সভাপতি রিয়াজ আকবর। কবি আসলাম পারভেজ বাদল (মুন্না মাস্টার) এর সঞ্চালনায় কবিতা পাঠ করেন কবি নাসিম বাগি, হাসনাইন রাজ, মোক্তার সাঈদী, আকবর হোসেন, শাহজাহান আমর, কারামুদ্দিন আজিমি, মুন্না এমাদী ও নিজাম নাজমী, সাংবাদিক নওশঅদ আনসারীসহ প্রখ্যাত সব উর্দু কবিরা।
গভীর রাত পর্যন্ত চলা ওই আয়োজনে বিপুলসংখ্যক শ্রোতার উপস্থিতি ছিল। কবিদের কবিতা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতাদের স্বতঃস্ফুর্ত সাড়া ও করতালিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন।
কবি নাসিম বাগি বলেন, মোশায়রা আমাদের প্রাণের স্পন্দন, আমাদের সংস্কৃতি। স্থানীয় সংস্কৃতিকে উজ্জীবিত করার পাশাপাশি তা রক্ষার জন্যই আমরা এ ধরনের মোশায়রার আয়োজন করে থাকি। বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। ভাষার জন্য যুদ্ধ করা একমাত্র দেশ বাংলাদেশ। তাই স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
কবি আসলাম পারভেজ বলেন, ৩০-৪০ বছর আগে সৈয়দপুরের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এ ধরনের মোশায়রা হতো। তখন দর্শক-শ্রোতাদের উপচেপড়া ভিড় থাকত। সময় বদলেছে, আয়োজন কমেছে; কিন্তু স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষায় এখনো মোশায়রার প্রয়োজন রয়েছে। এটি এমন একটি আয়োজন, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অংশ নিতে পারেন এবং নিজ নিজ ভাষায় কবিতা পাঠ করেন।
এসপিজিআরসি সভাপতি রিয়াজ আকবর বলেন, ভাষা বাংলা হোক, উর্দু হোক কিংবা হিন্দি! ভাষা সৃষ্টিকর্তার দান। প্রত্যেক মানুষ তার নিজ ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করবে, এটাই স্বাভাবিক। মোশায়রা সৈয়দপুরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির একটি অংশ। তাই আমরা বিভিন্ন স্থানে আবারও এ ধরনের আয়োজন করার চেষ্টা করছি এবং আগের মতোই মানুষের আগ্রহ ও সাড়া পাচ্ছি।
স্থানীয়রা জানান, মোশায়রা সৈয়দপুরের একটি ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। উর্দু ভাষার কবিতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা হলেও এ আয়োজন কেবল একটি ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা, হিন্দি ও উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষার কবিরাও এতে অংশ নিয়ে নিজ নিজ রচিত কবিতা পাঠ করেন। ফলে মোশায়রা হয়ে উঠেছে সৈয়দপুরের বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নিয়মিত এমন আয়োজন করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









