মৎস্য অধিদপ্তরের ১০৩টি অনাপত্তি সনদ (এনওসি) বাতিলের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। এনওসি বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর ভারতীয় অংশে আগে থেকেই ইলিশ কিনে রাখা আমদানিকারকদের একটি অংশ বিপাকে পড়েছেন। সরকারি অনুমোদনের ভিত্তিতে মাছ কেনা ও আমদানির প্রস্তুতিতে অর্থ বিনিয়োগের পর হঠাৎ অনুমোদন বাতিল হওয়ায় সেই বিনিয়োগ এখন ঝুঁকিতে। বিশেষ করে ইলিশ পচনশীল হওয়ায় দ্রুত ব্যবস্থা না হলে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ১০৩টি এনওসি বাতিল করা হয়।
এনওসির আওতায় চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত থেকে দেশে এসেছে প্রায় ৫৩৫ টন ইলিশ।
বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে জুলাই ও আগস্ট মাসে ভারত থেকে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ এসেছে। দুই মাসে আমদানি করা মাছের পরিমাণ প্রায় ৩৫২ দশমিক ৭৮৬ টন। এর আগের বছর, ২০২৫ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ এসেছিল মাত্র ১৭ দশমিক ৮৫ টন।
ব্যবসায়ীরা জানান, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর আমদানিকারকদের একটি অংশ ভারতীয় বাজারে ইলিশ কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেন। কেউ কেউ মাছ কিনে সীমান্তের ওপারে রেখে দেন বাংলাদেশে পাঠানোর অপেক্ষায়। এখন আমদানি বন্ধ থাকায় এসব মাছ সময়মতো দেশে আনা সম্ভব না হলে কম দামে ফেরত দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে মাছের ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি পরিবহন, শ্রমিক ও আমদানি প্রক্রিয়ার অন্যান্য খরচও লোকসানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, ইলিশ আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা সরকারি অনুমোদনের ওপর নির্ভর করেই আগাম প্রস্তুতি নেন। ভারতীয় অংশে মাছ কেনা এবং আমদানির বিভিন্ন ধাপে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। হঠাৎ এনওসি বাতিল হওয়ায় যারা আগে মাছ কিনেছেন, তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, অনুমোদনের ভিত্তিতেই আমদানিকারকরা ভারতীয় অংশে তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েছিলেন। এখন সনদ বাতিল হওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। ভারতীয় অংশে কেনা মাছ বাংলাদেশে আনতে না পারলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
ইলিশ আমদানিকারক সৈয়েদ মহিদুল হক রুবাই বলেন, আমদানির উদ্দেশ্যে ভারতীয় অংশে ইলিশ কিনে রাখা হয়েছিল। এখন আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব মাছ কম দামে ফেরত দিতে হবে। এর সঙ্গে আমদানি প্রক্রিয়ায় হওয়া অন্যান্য খরচের লোকসানও রয়েছে।

বেনাপোলের জনতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী কুদ্দুস আলী বিশ্বাস বলেন, সরকারি অনুমোদনের ওপর নির্ভর করেই ব্যবসায়ীরা ভারতীয় অংশে মাছ কেনেন। হঠাৎ আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে মাছের ক্রয়মূল্য, পরিবহন, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচের অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। ইলিশ পচনশীল হওয়ায় সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ে।
এদিকে ভারতীয় ইলিশের বাজারমূল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি ইলিশের আমদানি মূল্য ২৫২ টাকা দেখানো হয়েছে। শুল্ক, অন্যান্য সরকারি ব্যয় ও পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। তবে খুচরা বাজারে এই ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, বাজারে ইলিশের উৎস সম্পর্কে ক্রেতাদের পরিষ্কার তথ্য থাকা দরকার। দেশি না আমদানি করা মাছ, তা জানা গেলে ক্রেতারা দাম ও মান বিবেচনা করে মাছ কিনতে পারেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রাহেলা বেগম বলেন, ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা দরকার। মাছ দেশি না আমদানি করা, সে তথ্য পরিষ্কার না থাকলে ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
জেলা ভোক্তা অধিকার কার্যালয়ও বাজারে মাছের উৎস ও বিক্রয়মূল্য তদারকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যশোর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান বলেন, আমদানি করা মাছ দেশি মাছের নামে বিক্রি করা হলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









