শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় এখন উৎসবের আমেজ। ঢাকের বাদ্য, রঙ-তুলির আঁচড়, মণ্ডপসজ্জা আর প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততায় মুখর উপজেলার গুলিসাখালী ইউনিয়নের কবুতরখালী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘রাজমন্দির’ প্রাঙ্গণ। বিশাল এই আয়োজন ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আয়োজক, শিল্পী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা।
এবারের আয়োজনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ—একটি মণ্ডপে ১৬০টি দেব-দেবীর প্রতিমা। আয়োজকদের দাবি, বৈচিত্র্যময় থিম, নান্দনিক প্রতিমা ও বিস্তৃত আয়োজনের কারণে এবারের দুর্গাপূজা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বড় পূজামণ্ডপে পরিণত হতে যাচ্ছে।
মন্দিরের বিশাল আঙিনাজুড়ে চলছে প্যান্ডেল নির্মাণ, রঙের কাজ, আলপনা ও আলোকসজ্জার প্রস্তুতি। কোথাও শিল্পীর হাতে প্রতিমার শেষ আঁচড়, কোথাও আবার চলছে মণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। সব মিলিয়ে উৎসব শুরুর আগেই রাজমন্দির প্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয়েছে এক বিশাল শিল্পকর্মের কর্মশালায়।
আয়োজকরা জানান, আগামী ১৫ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। বিগত বছরগুলোতে প্রতিমার সংখ্যা আরও বেশি থাকলেও এবার সংখ্যায় কিছুটা কমিয়ে প্রতিটি প্রতিমার নান্দনিকতা, থিমের বৈচিত্র্য ও সার্বিক মানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সংখ্যায় কমলেও আয়োজনের ব্যাপ্তি কমেনি। বরং বিশাল মন্দির প্রাঙ্গণজুড়ে স্থান পাচ্ছে দেব-দেবীর মোট ১৬০টি সুদৃশ্য প্রতিমা।
এই ব্যতিক্রমী পূজার যাত্রা অবশ্য একদিনে শুরু হয়নি। ২০১৬ সালে মাত্র ৪০টি প্রতিমা নিয়ে হালদার বাড়িতে এ আয়োজনের সূচনা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও উৎসাহ বাড়তে থাকে। সেই ছোট পরিসরের উদ্যোগই ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে আজ রূপ নিয়েছে বড় এক উৎসব আয়োজনে।
রাজমন্দিরের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা অর্থোপেডিকস বিশেষজ্ঞ ডা. সুদীপ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. স্নিগ্ধা চক্রবর্তী। স্থানীয় একঝাঁক উদ্যমী তরুণ-তরুণীকে সঙ্গে নিয়ে হালদার বাড়িতে তারা আয়োজন করছেন এই দুর্গোৎসব। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, মানবিকতা ও সামাজিক সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই এবারের আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

ডা. সুদীপ কুমার হালদার বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু পূজা উদযাপন নয়; সব ধর্মের মানুষের একটি মেলবন্ধন তৈরি করা এবং সমাজের ইতিবাচক বার্তাগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।’
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে মন্দির প্রাঙ্গণে দেশের গুণীজনদের ছবি ও তাদের নীতিবাক্য সংবলিত বিভিন্ন ব্যানার টাঙানো হয়েছে। ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি এসব আয়োজন দর্শনার্থীদের সামনে মানবিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ইতিবাচক সামাজিক বার্তা তুলে ধরবে।
রাজমন্দিরের এবারের আয়োজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক সেবা যুক্ত করা। পূজামণ্ডপে আসা মায়েদের কথা বিবেচনায় তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’। সেখানে শিশুদের মায়েরা প্রয়োজন অনুযায়ী নিরিবিলি পরিবেশে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সেখান থেকে স্যানিটারি প্যাড বিতরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ডা. স্নিগ্ধা চক্রবর্তী জানান, নারী ও শিশুদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি ধর্মীয় উৎসব যেন মানুষের জন্য আরও স্বস্তিদায়ক ও মানবিক হয়ে ওঠে, সেই ভাবনা থেকেই এই ব্যবস্থা।
দুর্গাপূজার আনন্দ ভাগ করে নিতে আয়োজন করা হয়েছে গণভোজেরও। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুরে হাজারো মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা থাকবে। শুধু পূজায় অংশ নিতে আসা ভক্তদের জন্য নয়, এই গণভোজের মাধ্যমে উৎসবের আনন্দ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি দুস্থ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকছে। ফলে পূজার আয়োজনটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সামাজিক সহায়তা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।
এত বিশাল আয়োজনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের শ্রম। প্রতিমা শিল্পী উজ্জ্বল বিশ্বাস জানান, প্রায় চার থেকে পাঁচ মাসের নিবিড় শ্রমে প্রতিমাগুলো তৈরি করা হয়েছে। মাটি, খড়, রং ও তুলির নিপুণ ব্যবহারে একেকটি প্রতিমা পেয়েছে স্বতন্ত্র রূপ। এত বড় পরিসরে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রতিমা তৈরির কাজ চ্যালেঞ্জিং হলেও এর সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের কাছে এটি আনন্দ ও সৃজনশীলতারও অভিজ্ঞতা।
বিপুলসংখ্যক প্রতিমা দেখতে এবারও রাজমন্দিরে বিপুল দর্শনার্থীর সমাগম হবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। মঠবাড়িয়া থানার অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম জানান, বড় এই আয়োজন ও ভক্তদের আগমনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি আনসার এবং আয়োজকদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দলও সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে।
রাজমন্দিরের এবারের দুর্গোৎসব তাই শুধু ১৬০টি প্রতিমার সমারোহ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্প, সৃজনশীলতা, মানবিকতা, নারী ও শিশুবান্ধব উদ্যোগ, গণভোজ, শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা।
২০১৬ সালে ৪০টি প্রতিমা দিয়ে শুরু হওয়া যে আয়োজন সময়ের সঙ্গে বড় হয়েছে, এবারের ১৬০ প্রতিমার আয়োজন তারই ধারাবাহিকতা। তবে আয়োজকদের কাছে এর সাফল্য কেবল প্রতিমার সংখ্যা বা মণ্ডপের বিশালতায় নয়; বরং ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কতটা ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেটিই বড় বিষয়।
১৫ অক্টোবর ষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে দুর্গোৎসব। সেদিন থেকে কবুতরখালীর রাজমন্দির শুধু পূজার স্থান হিসেবেই নয়, উৎসব, শিল্প, মানবিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক মিলনমেলায় পরিণত হবে—এমন প্রত্যাশাই আয়োজকদের।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









