‘‘প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর একটি চাকরি ছিল, সেটিও ছেড়ে দিয়েছি। আট মাস অপেক্ষা করেছি নিয়োগপত্র পাওয়ার আশায়। এখন যখন নিয়োগপত্র পাওয়ার কথা, তখন দেখি তালিকায় আমার নাম নেই। কী করব, কোথায় যাব কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। এখন বেঁচে থাকাই দায় হয়ে গেছে।’’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থী অসীম কুমার দাস।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে বঞ্চিত প্রার্থীরা জেলা প্রশাসকের বাংলোর সামনে দুই ঘন্টাব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
এ সময় তারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে পুনঃতদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবি জানান।
অসীম কুমার দাস বলেন, ‘‘এবারই ছিল আমার শেষ সুযোগ, বয়সও শেষ হয়ে গেছে। পরিবারকে কী বলব, কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি কখনো রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। আমার নামে কোনো মামলাও নেই। কেন আমাকে বাদ দেওয়া হলো, সেটাও জানি না।’’
শুধু অসীম নন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও সুনামগঞ্জের আরও ১১৯ প্রার্থী নিয়োগপত্র থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে কী কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি বলে দাবি তাদের। দীর্ঘ আট মাস নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা এসব প্রার্থীর অনেকে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ নিয়েছেন যোগদানের প্রস্তুতি। চূড়ান্ত নিয়োগের মুহূর্তে তালিকায় নাম না থাকায় এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
তাহিরপুর উপজেলার কাউকান্দি গ্রামের আমিরুল হাসান ২০২১ সালে এমসি কলেজ থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর গত আট মাস ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম। নিয়োগপত্রে নিজের নাম না থাকায় হতাশ হয়েছি। কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই এবং থানায় কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরিও নেই।’’
একই গ্রামের বাসিন্দা মহসিন মিয়া সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স সম্পন্ন করেছেন। পিতামাতাহীন মহসিন টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি জানতে পেরে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানান।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের সামন্ত কুমার দাস জানান, মেধাতালিকায় তিনি উপজেলায় নবম অবস্থানে ছিলেন। দীর্ঘ আট মাস অপেক্ষার পর যোগদানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত নিয়োগ তালিকায় নিজের নাম না থাকায় হতাশ হয়েছেন তিনি। তার দাবি, তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস জানান, জেলায় মোট ৬৩৫ জন শিক্ষক পদের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আপাতত ১২০ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হচ্ছে না। তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দু-এক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান বলেন, ‘‘সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে অনেকে নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তিনি বিভাগীয় পর্যায়ে কথা বলছেন। চাকরিপ্রার্থীদের ন্যায়সংগত অধিকারের পক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু আইনগত সহযোগিতা করা সম্ভব, তা করা হবে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









