সড়কজুড়ে সারি সারি ব্যাটারিচালিত রিকশা। এর ফাঁকে ফাঁকে ছুটছে হলুদ অটোরিকশা। কোথাও যাত্রী ওঠাতে হঠাৎ থেমে যাচ্ছে, কোথাও আবার যানজট এড়িয়ে যেতে বিপজ্জনকভাবে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে অন্য যানবাহনকে। ব্যস্ত সড়ক, মোড় কিংবা বাজার, নগরীর প্রায় সর্বত্রই এখন ছোট ছোট থ্রি-হুইলারের দাপট।
বরিশাল নগরীর মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের বড় ভরসা এসব যানবাহন হলেও অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। চালকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি, ট্রাফিক আইন না মানা এবং অনেক যানবাহনের দুর্বল ব্রেকিং ব্যবস্থার অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে গত ছয় মাসে নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত তিনজন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
ফলে একদিকে যেমন যানজটে নাকাল নগরবাসী, অন্যদিকে প্রতিদিন সড়কে বের হয়েই দুর্ঘটনার শঙ্কা নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে তাদের।
৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় আট লাখ মানুষের বসবাস। বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতের জন্য নগরীর সড়ক অবকাঠামো প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। এর মধ্যে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, হলুদ অটোরিকশা ও অন্যান্য থ্রি-হুইলারের সংখ্যা। ফলে একই সড়কে যানবাহনের চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।
নগরবাসীর অভিযোগ, ব্যাটারিচালিত রিকশা কিংবা অটোরিকশা চালানোর জন্য অনেক চালকের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই। যে কেউ এসব যানবাহন চালানো শুরু করছেন। ফলে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং বেপরোয়া চালানোর প্রবণতায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ ও জনসুরক্ষা ফোরামের আহ্বায়ক শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের অনেকেরই কোনো প্রশিক্ষণ নেই। এসব যানবাহনের বিশেষ করে ব্রেকিং সিস্টেমের ওপর চালকদের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণও নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
নগরবাসী বলছেন, শুধু চালকের দক্ষতার ঘাটতিই নয়, যানবাহনের কারিগরি সক্ষমতাও নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। কারণ হঠাৎ ব্রেক কষে থামাতে না পারা কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো পরিস্থিতি বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
বরিশালের সড়কে যানবাহনের চাপের চিত্র আরও স্পষ্ট হচ্ছে বিআরটিএর তথ্যে। সংস্থাটির হিসাবে, নগরীতে প্রায় ২৭ থেকে ২৮ হাজার থ্রি-হুইলার অবৈধভাবে চলাচল করছে।
বরিশাল বিআরটিএর পরিচালক জিয়াউর রহমান বলেন, এসব অবৈধ থ্রি-হুইলারের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক রয়েছে। অবৈধ থ্রি-হুইলার চলাচলের কারণে নগরীতে যানজট বাড়ছে এবং প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে।
নগরীর সড়কে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের প্রভাব পড়ছে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানেও। গত ছয় মাসে বরিশাল নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
তবে পুলিশের দাবি, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন তারা।
বরিশাল ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ইমদাদ হুসাইন বলেন, সকাল, সন্ধ্যা ও রাতে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের মোতায়েন করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে তারা নিয়মিত কাজ করছেন।
যানবাহন নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক চাপ বা বাধার অভিযোগও রয়েছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, তারা একটি ‘হেলদি সিটি’ গড়ে তুলতে চান। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সচেতন একটি গ্রুপ আবার এসব যানবাহনের পক্ষ নিয়ে কাজ করছে, যা সিটি করপোরেশনের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল নগরীতে প্রায় ৩০ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। এর মধ্যে ১৫ থেকে ১৬ হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং ১০ থেকে ১১ হাজার হলুদ অটোরিকশা। বাকি ২ থেকে ৩ হাজারের মধ্যে রয়েছে সিএনজি অটোরিকশা ও প্যাডেলচালিত রিকশা।
অর্থাৎ আট লাখ মানুষের নগরীতে সীমিত সড়কের ওপর প্রতিদিন চাপ তৈরি করছে বিপুলসংখ্যক ছোট যানবাহন। যাত্রী পরিবহনে এসব যানবাহনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল এখন নগর ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরবাসীর দাবি, শুধু অভিযান চালিয়ে কিংবা কিছু যানবাহন আটক করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। চালকদের প্রশিক্ষণ, বৈধতা যাচাই, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, ব্রেকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট রুট ও স্টপেজ ব্যবস্থাপনার মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় পুলিশ, বিআরটিএ ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
নগরবাসী চান, যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এসব অটোরিকশা বন্ধ নয়—বরং শৃঙ্খলার মধ্যে আসুক। কারণ স্বস্তির যাতায়াতের জন্য যে যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়, সেটিই যেন সড়কে আতঙ্কের কারণ না হয়ে ওঠে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









