কৃষক বাবার ছেলে আজ বিচারক হওযার পথে। রাজশাহী থেকে বাড়ি ফিরেছেন কাজল পাঁড়ে। গ্রামের শিক্ষার্থীরা তখন তার অপেক্ষায়। হাতে ফুলের মালা। কাজল কাছে আসতেই তাকে ঘিরে ধরে তারা। মালা পরিয়ে বরণ করে নেয়। পাশে দাঁড়িয়ে মা পঞ্চমী জেড়ি ও বড় বোন কল্পনা পাঁড়ে। আনন্দে ভাসছে মাধাই গ্রাম।
এই আনন্দের পেছনে আছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। আছে অভাব, বাবা-মায়ের ত্যাগ এবং আট বছর ধরে লালন করা একটি স্বপ্ন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাইপুর গ্রামের ২৯ বছর বয়সী কাজল পাঁড়ে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ (সহকারী জজ) হিসেবে সাময়িকভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ২০০ জনের তালিকায় তাঁর অবস্থান ১৪০তম।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় এক বন্ধুর ফোনে ফল প্রকাশের খবর পান কাজল। পরে ওয়েবসাইটে নিজের নাম দেখে নিশ্চিত হন। আট বছরের অপেক্ষার পর স্বপ্নপূরণের সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ে যায় কঠিন দিনগুলোর কথা।
কাজল বলেন, আমার আট বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার দিনই স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমি বিচার বিভাগের ক্যাডার হব।

তিনি আরও বলেন, এর পেছনে অনেক ত্যাগ, হতাশা জমা হয়ে আছে। অনেক কান্না জমা হয়ে আছে। সেই সব কঠিন দিনের কথাই মনে পড়েছে সবার আগে।
কাজল তুরি জনগোষ্ঠীর মানুষ। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট এবং পরিবারের একমাত্র ছেলে। ছোটবেলায় নিজের মাতৃভাষাতেই কথা বলতেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বাংলা ভাষার সঙ্গে পরিচয়। শুরুতে শিক্ষক ও সহপাঠীদের অনেক কথাই বুঝতে পারতেন না।
কাজল বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখি সবাই বাংলা কথা বলছে। আমার মাতৃভাষায় কথা বলেই আমি অভ্যস্ত ছিলাম। শিক্ষক ও সহপাঠীরা বাংলায় কথা বলায় শুরুতে তাদের কথা বুঝতে সমস্যা হতো।
ভাষার বাধা কাটিয়ে পড়াশোনায় মন দেন তিনি। এরপর সামনে আসে দারিদ্র্য। কাজলের বাবা নরেশ পাঁড়ে কৃষিকাজ করেন। এলাকায় সারা বছর কাজ না থাকায় তাকে নড়াইল, খুলনা ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় গিয়ে শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে। ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কখনো গরুও বিক্রি করেছেন।
সেই বাবাই ছেলের সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত। নরেশ পাঁড়ে বলেন, হামাদের কী যে আনন্দ হোইছে, কহিতে পারবো না। হামাদের বেটা যানি অনেক বড় হইয়া, গরিবের উপকারে লাগে। বেটার জন্যি বুক গর্বে ফুলে উঠিছে। অভাবের দিনগুলো মনে আছে কাজলের ছোট বোন স্বপ্নারও। উচ্চমাধ্যমিকের পর কাজল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কথা জানালে পরিবার দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। দূরে রেখে পড়ানোর খরচ জোগানো তাদের জন্য কঠিন ছিল।
কাজলের বোন স্বপ্না বলেন, আমরা ভাইকে বলেছিলাম, আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা কোথায় পাব? রাজশাহী গিয়ে পড়তে হবে না। তখন ভাই বলেছিল, ‘দিদি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে আমার টাকা লাগবে না।
কাজল কথা রেখেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। কখনো পরিবারকেও সহায়তা করেছেন। অভাবের দিনে পান্তা ভাত খেয়েও দিন পার করতে হয়েছে তাদের।
স্বপ্না বলেন, কত দিন আমরা পান্তা ভাত খেয়ে দিন পার করেছি। আজ আমার ভাই জজ হওয়ার পথে। এতে আমরা খুব খুশি।
২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর বিচার বিভাগে যাওয়ার স্বপ্ন আরও দৃঢ় হয় কাজলের। আইন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করেছেন, প্রস্তুতি নিয়েছেন জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার। দীর্ঘ আট বছর পর সেই স্বপ্নের প্রথম বড় স্বীকৃতি এসেছে।

কাজলের সাফল্যে আনন্দিত পুরো মাধাই গ্রাম। গ্রামের প্রবীণ জরাধন পাঁড়ে (৭০) বলেন, আনন্দেতে কান্দন আসছে রে ভাই। এ রকম জাগাতে হামাদের জাতিগোষ্ঠীর আর কেহু যাইতে পারিনি।
মাধাই গ্রামের মোড়ল নিরঞ্জন তিরকির আশা, কাজলকে দেখে এলাকার আদিবাসী ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় উৎসাহিত হবে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক বিভূতিভূষণ মাহাতোর ভাষ্য অনুযায়ী, তুরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাজল প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী। তার দাবি, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের মধ্যেও কাজলই প্রথম জুডিশিয়াল সার্ভিসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
তবে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে এখনো নিয়োগপ্রক্রিয়ার কিছু ধাপ বাকি। মেডিকেল পরীক্ষা ও পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষে নিয়োগ চূড়ান্ত হবে। কাজলের সামনে এখন নতুন দায়িত্বের অপেক্ষা। তার স্বপ্ন, বিচার বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে মানুষের জন্য কাজ করা।
মাধাই গ্রামের খাস পুকুরপাড়ের ঘর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সেখান থেকে জুডিশিয়াল সার্ভিস—এই পথচলায় অভাব ছিল, ছিল বাধা। কিন্তু থামেননি কাজল। যে পরিবার একসময় পান্তা ভাত খেয়ে দিন পার করেছে, সেই পরিবারের সন্তান আজ বিচারকের পথে। তাঁর সাফল্যে তাই আনন্দিত শুধু পরিবার নয়, পুরো মাধাই গ্রাম।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন








