পাবনার সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তচিন্তার ইতিহাসে রণেশ মৈত্র এক উজ্জ্বল নাম। প্রায় ছয় দশকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চা এবং নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের পথ দেখিয়ে সহকর্মীদের কাছে ‘পাবনার সাংবাদিকদের বাতিঘর’ হিসেবে পরিচিতি পান।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রণেশ মৈত্রের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান পাবনা প্রেসক্লাবে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়।
১৯৩৩ সালের ৪ অক্টোবর রাজশাহীর নওহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রণেশ মৈত্র। তার পৈতৃক নিবাস পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ভুলবাড়িয়া। বাবা রমেশ চন্দ্র ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ১৯৫০ সালে পাবনা জিসিআই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাসের পর তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনেই সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের অধিকার নিয়ে তার ভাবনার বিকাশ ঘটে।
১৯৫১ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক নওবেলাল’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন তিনি। পরে কলকাতার দৈনিক ‘সত্যযুগ’ এবং ১৯৫৫ সালে ‘দৈনিক সংবাদ’-এ যোগ দেন। এরপর ‘ডেইলি মর্নিং নিউজ’, ‘দৈনিক অবজারভার’, ‘দ্য নিউ নেশন’ ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ সাংবাদিকতা করেন। দীর্ঘ সময় এসব পত্রিকার পাবনা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দ্য নিউ নেশনের মফস্বল সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—দেশের গুরুত্বপূর্ণ নানা অধ্যায়ের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন রণেশ মৈত্র। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে পাবনায় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিতে ‘শিখা সংঘ’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।
পাবনার সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে তার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬১ সালে পাবনায় সাংবাদিকদের সংগঠিত করার উদ্যোগে তিনি ভূমিকা রাখেন এবং পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই বছর প্রতিষ্ঠিত পাবনা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
লেখক ও কলামিস্ট হিসেবেও রণেশ মৈত্রের পরিচিতি ছিল। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘রুদ্র চৈতন্যে বিপন্ন বাংলাদেশ’। তার জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘নিঃসঙ্গ পথিক’। তার লেখায় সময়, সমাজ, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও ব্যক্তিজীবনের নানা অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে পাবনায় পেশাগত জীবনের সুবর্ণজয়ন্তীতে তাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৮ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।
২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে মারা যান রণেশ মৈত্র। তার মৃত্যুতে সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।
শারীরিকভাবে তিনি নেই, তবে তার দীর্ঘ কর্মজীবন, সাংবাদিকতার আদর্শ, লেখা ও স্মৃতি আজও পাবনার সাংবাদিক সমাজে প্রাসঙ্গিক। সত্য, ন্যায় ও মানুষের পক্ষে সাংবাদিকতার যে পথ তিনি দেখিয়ে গেছেন, নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে এটাই তার উত্তরাধিকার।

সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন








