তেহরানে গত মাসে এক আলোকচিত্রী এমন একটি দৃশ্য ধারণ করেছিলেন, যা প্রথম দেখায় খুব সাধারণ। কয়েকজন মানুষ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তাদের পাশেই বিশাল একটি মার্কিনবিরোধী বিলবোর্ড। কিন্তু কেউ সেটির দিকে তাকাচ্ছেন না।
ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘ফরেন এ্যাফেয়ারস’ -এর সেপ্টেম্বর–অক্টোবর সংখ্যায় জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্ক লিঞ্চের ‘দ্য এন্ড অব দ্য আমেরিকান মিডল ইস্ট’ প্রবন্ধের সঙ্গে। লিঞ্চের বক্তব্য, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর ওয়াশিংটন যে আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, সেটি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ ছিল সেই ব্যবস্থার শেষ আঘাত—যদিও তার ভিত বহু বছর ধরেই ক্ষয়ে যাচ্ছিল।
প্রশ্ন হলো, এত দিন পর কেন এমন কথা এত স্পষ্টভাবে বলা সম্ভব হলো—এমন একটি সাময়িকীতে, যাকে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি-প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক মঞ্চ হিসেবে দেখা হয়? ১৯৯১ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ব্যবস্থা দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েছিল। একদিকে ছিল ইরান ও ইরাককে নিয়ন্ত্রণে রাখার সামরিক কাঠামো—উপসাগর থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত মার্কিন ঘাঁটি ও বাহিনী। অন্যদিকে ছিল আরব শাসকদের সঙ্গে এক অলিখিত সমঝোতা: আমেরিকা নিরাপত্তা দেবে, বিনিময়ে শাসকেরা অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন নিয়ে খুব বেশি প্রশ্নের মুখে পড়বেন না এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নটি চলতে থাকবে অন্তহীন ‘শান্তি প্রক্রিয়ার’ মধ্যে।
আরব বিশ্বের কয়েকটি প্রজন্ম এই বাস্তবতার মধ্যেই বড় হয়েছে। শাসকদের জন্য সামরিক সহায়তা ছিল, কিন্তু তাঁদের কারাগার নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। ফিলিস্তিনিদের জন্য শান্তি আলোচনা ছিল, কিন্তু রাষ্ট্র ছিল না। আর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক চাপ থেকে রক্ষা করার জন্য ছিল আমেরিকার কূটনৈতিক ঢাল। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও ছিল এখানেই—এটি জনগণের কাছে জবাবদিহির জন্য তৈরি হয়নি।
একটি পরাশক্তি যখন তার মিত্রদের প্রায় নিঃশর্ত নিরাপত্তা দেয়, তখন মিত্ররা নিজেদের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য দিতে শেখে না। তারা জানে, বড় অংশের খরচ অন্য কেউ বহন করবে। ইয়েমেনে সৌদি যুদ্ধ তার একটি উদাহরণ। আমেরিকার সমর্থন রিয়াদকে এমন এক যুদ্ধে দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ দিয়েছে, যার স্পষ্ট বিজয়-পরিকল্পনা ছিল না।
গাজায় এই ব্যবস্থার পরিণতি আরও ভয়াবহ। ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে বিপুল প্রাণহানি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সময়ে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে ওয়াশিংটন যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, ইসরায়েলের ক্ষেত্রে তার মিত্রকে দীর্ঘদিন যে রাজনৈতিক সুরক্ষা দিয়েছে, তাতে আমেরিকার দ্বৈত মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আমেরিকার নৈতিক কর্তৃত্বে—বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণে। একই সঙ্গে আমেরিকার ভেতরেও ইসরায়েল-নীতি নিয়ে প্রজন্মগত বিভাজন বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হয়েছে ব্যাপক প্রতিবাদ। কোনো পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি তখনই সত্যিকার অর্থে নড়বড়ে হয়ে যায়, যখন বাইরের মানুষ তার ওপর আস্থা হারায় এবং ভেতরের মানুষও তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আমেরিকার আরেকটি বড় ভুল ছিল সাধারণ আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন গুরুত্ব না দেওয়া। ২০১১ সালের আরব অভ্যুত্থানগুলো যখন রুটি, মর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবি তুলল, ওয়াশিংটনের প্রধান উদ্বেগ ছিল না কীভাবে জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হবে। বরং পুরোনো কাঠামো কীভাবে কম খরচে টিকিয়ে রাখা যায়, সেই হিসাবই বড় হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসও আরব জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের চেয়ে শাসকগোষ্ঠীগুলোর নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সমঝোতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পুরোনো ব্যবস্থার ওপর দুটি বড় ধাক্কা এসেছে—নৈতিক ও সামরিক।
গাজা আমেরিকার নৈতিক কর্তৃত্বকে ক্ষয় করেছে। আর সামরিক ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে আমেরিকার ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ব্যাপক অভিযান সত্ত্বেও উত্তর সীমান্তে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। হুতিরা লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট নৌবাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে, আমেরিকা ও ব্রিটেনের হামলার পরও যা পুরোপুরি থামানো যায়নি। একটি অরাষ্ট্রীয় শক্তি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে এমন চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে—এটি প্রচলিত সামরিক শক্তির ধারণার জন্যই বড় প্রশ্ন।
এরপর ইরান সরাসরি ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইসরায়েলকে রক্ষায় মার্কিন সামরিক শক্তির সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছে। আর ২০২৬ সালের যুদ্ধে যখন উপসাগরীয় মিত্রদেরও পুরোপুরি রক্ষা করা গেল না, তখন আমেরিকার নিরাপত্তা-ছাতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ কাতার থেকে বাহরাইন পর্যন্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্কের মূল যুক্তি ছিল—আমেরিকা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে, নৌপথ নিরাপদ রাখবে এবং মিত্রদের সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও রক্ষা করবে। যদি সেই প্রতিশ্রুতি কার্যকর না হয়, তাহলে ১৯৯১ সালের ব্যবস্থার ভিত্তিটাই দুর্বল হয়ে যায়। তবু আমেরিকার প্রভাব রাতারাতি শেষ হয়ে যায়নি। ইতিহাসে সাম্রাজ্যের পতন সচরাচর কোনো এক দিনের ঘটনা নয়। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের পরও ব্রিটেন ও ফ্রান্স বহু বছর মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব ধরে রেখেছিল। কিন্তু তখনই বোঝা গিয়েছিল, তাদের ইচ্ছা আগের মতো আর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
আজকের পার্থক্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলো ইতিমধ্যে বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ওয়াশিংটন সেই সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী ছিল না। এরপর উপসাগরীয় দেশগুলো চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে; কেউ কেউ ব্রিকসেও যোগ দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা নয়। বরং ভবিষ্যতে আমেরিকার নিরাপত্তা-নিশ্চয়তা দুর্বল হলে যাতে বিকল্প থাকে, তার প্রস্তুতি। আর এটাই বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা।

ইসরায়েল ও ইরান—দুই শক্তিই দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা থেকে রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। ইসরায়েলের ক্ষেত্রে যুদ্ধের পরিবেশ বসতি সম্প্রসারণকে ন্যায্যতা দেওয়ার যুক্তি তৈরি করে এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নের রাজনৈতিক সমাধান পিছিয়ে দেয়। ইরানের ক্ষেত্রে বহিঃশত্রুর উপস্থিতি অভ্যন্তরীণ কঠোরতার পক্ষে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করে। আর ওয়াশিংটন, আনুষ্ঠানিকভাবে অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা-দাতা হয়েও, দুই পক্ষকেই নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করার মতো রাজনৈতিক হাতিয়ার ক্রমেই হারাচ্ছে। সবচেয়ে বড় খরচ অবশ্য দেয় সেই জনগণ, যাদের এই ব্যবস্থা তৈরির সময় কোনো প্রশ্ন করা হয়নি।
মিসর তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। যুদ্ধের সরাসরি পক্ষ না হয়েও কায়রোকে বহন করতে হচ্ছে জ্বালানি ও খাদ্যের বাড়তি দাম, সুয়েজ খালের আয় কমে যাওয়ার চাপ এবং দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক সংকটের নতুন বোঝা। ভূরাজনীতির মানচিত্রে এগুলো হয়তো ছোট সংখ্যা। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে এগুলোই যুদ্ধের বাস্তব মূল্য। লিঞ্চের প্রস্তাব হলো—সামরিক হস্তক্ষেপকে প্রথম পছন্দ না করা, ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার বদলে কূটনীতির পথে যাওয়া, মানবাধিকারকে সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা এবং এমন একটি বহুমেরু মধ্যপ্রাচ্য মেনে নেওয়া, যার ভবিষ্যৎ শুধু ওয়াশিংটন নির্ধারণ করবে না।
সমস্যা হলো, এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক ইচ্ছা কোথা থেকে আসবে? আমেরিকা এখনও শক্তিশালী। তার সামরিক ঘাঁটি আছে, মিত্র আছে, অর্থনৈতিক ক্ষমতা আছে। তাই ‘আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য থেকে চলে গেছে’ বলা বাস্তবতার অতিসরলীকরণ। পরিবর্তনটি বরং আরও সূক্ষ্ম: আমেরিকা এখনও আছে, কিন্তু আগের মতো একমাত্র কেন্দ্র হিসেবে নেই। সম্ভবত এটাই পুরোনো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
তেহরানের সেই ছবিতে ফিরে আসা যাক। মানুষগুলো বিলবোর্ডটির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তারা প্রতিবাদ করছে না, স্লোগানও দিচ্ছে না। শুধু তাকাচ্ছে না। একটি শক্তির পতন সব সময় তার পতাকা নামানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো শুরু হয় তার প্রতীককে আর গুরুত্ব না দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পুরোনো ব্যবস্থা কোনো একদিনে ভেঙে পড়েনি। ইরাক যুদ্ধ তাকে দুর্বল করেছে, ২০১১ সালের অভ্যুত্থান তার রাজনৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্ন করেছে, গাজা তার নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষয় করেছে এবং ইরান যুদ্ধ তার সামরিক সীমা প্রকাশ করেছে। পুরোনো ঘাঁটি থাকবে, অস্ত্র থাকবে, বৈঠক হবে, মিত্ররাও থাকবে। কিন্তু বিশ্বাস বদলে যেতে পারে।
সেদিন তেহরানের মানুষগুলোর মতো মধ্যপ্রাচ্যের অন্য মানুষও হয়তো পুরোনো আমেরিকান প্রতীকের পাশ দিয়ে হেঁটে যাবে—একবারও না তাকিয়ে। আর তখন কেউ হয়তো বলতে পারবে না, ঠিক কোন দিন থেকে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের শুরু হয়েছিল।
সূত্র: মিডেল ইস্ট আই, হিশাম গাফার (ইসলামি চিন্তা ও আন্দোলন এবং সংঘাত বিষয়ক গবেষক।)


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন








