মিজানুর রহমানের চোখে আলো নেই, তবু স্বপ্ন একটি স্থায়ী চাকরির। রোকসানার অঙ্গহীন জীবনে ভিক্ষা ছেড়ে বাঁচতে চান সম্মান নিয়ে। অন্যদিকে শুক্কুর আলী স্ট্রোক করে হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা, ঠাঁই নেই পরিবারের মাথা গোঁজার। এমন প্রতিকূলতায় যখন তিনজন অসহায় মানুষের জীবন স্থবির, তখন এগিয়ে এলেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নিয়ে হতাশা ও অনিশ্চয়তার মাঝে জ্বালালেন আশার আলো।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক গণশুনানিতে নিজেদের কষ্ট ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন তার তিনজন।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মিজানুরের স্বপ্ন একটি চাকরি
শ্রীপুর উপজেলার বনখরিয়া এলাকার বাসিন্দা ৩৯ বছর বয়সী মিজানুর রহমান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন তিনি। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েটিও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং ঢাকার জাতীয় বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্রে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলে মাদরাসার হিফজ বিভাগে পড়ছে।
অসুস্থ মাকে দেখাশোনার পাশাপাশি স্ত্রী-সন্তানদের দায়িত্বও মিজানুরের ওপর। কিন্তু নিজের কোনো জমিজমা না থাকায় সংসার চালানো তার জন্য অসাধ্য হয়ে পড়েছে।
ডিসিকে মিজানুর জানান, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে একটি সরকারি চাকরি তার খুব প্রয়োজন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের পরিস্থিতির কথা জানানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি।
মিজানুরের কথা শুনে তার পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক। তার মেয়েও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।
পাশাপাশি মিজানুর চাইলে নিজ উদ্যোগেও তার জন্য চাকরির ব্যবস্থা করার কথা বলেন জেলা প্রশাসক।
ভিক্ষা ছেড়ে সম্মান নিয়ে বাঁচতে চান রোকসানা
গাজীপুর মহানগরের মাষ্টারবাড়ি এলাকায় বসবাসকারী এই রোকসানার বাড়ি বগুড়ায়। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই মুখোমুখি হন কঠোর বাস্তবতার। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে ট্রেন দুর্ঘটনায় তার হারান ডান পা এবং বাঁ হাতের তিনটি আঙুল। এরপর থেকেই জীবন চালাতে করতে হয় ভিক্ষাবৃত্তি।
পরবর্তীতে সুখের আশায় বিয়ে করেন রাজমিস্ত্রির সহকারীকে। কিন্তু স্বামীর আয়ও অনিয়মিত। এরমধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হন তিনি। সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন তার স্বামী। এরপর থেকে সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে জীবিকার সন্ধানে গাজীপুরে আসেন রোকসানা। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও অসহায়ত্বের কারণে তাকে আবারও ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরতে হয়।
‘গরিবের বন্ধু’ জেনে জেলা প্রশাসকের কাছে আসেন তিনি। শোনান দুঃখগাথা রোকসানা।
তার কথা শুনে উদ্যোগ নেন জেলা প্রশাসক। গাজীপুরের কাশিমপুরের সুনামধন্য পোশাক কারখানায় চাকরির ব্যবস্থা করে দেন।
শুক্কুরের চাওয়া শুধু একটি ঘর
পূবাইলের হারবাইদ এলাকার শুক্কুর আলীর। পেশায় ছিলেন দিনমজুর। নেই এতটুকু মাথা গোঁজার ঠাঁই। তাই অন্যের করুণাই তার ভরসা।
প্রায় দুই বছর আগে স্ট্রোক করে কর্মক্ষমতা হারান তিনি। পরিবারের দায়িত্ব পালন তো দূরের কথা, নিরাপদ আশ্রয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
শুক্কুরের এ দুর্দশা দেখে এক ব্যক্তি ঘর নির্মাণের জন্য কিছু জমি দিতে চেয়েছেন। কিন্তু ঘর তৈরির সামর্থ্য নেই তার। তাই জেলা প্রশাসকের কাছে সহযোগিতা চান তিনি। তাকে আশাহত করেননি জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। আশ্বাস দেন ঘর নির্মাণে সহযোগিতা করার।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘‘প্রতি বুধবার সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা শুনি। তাদের সহযোগিতা করা চেষ্টা করি। তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা যা কাওকে বলতে পারেন না, সেগুলো শুনে বব্যস্থা নেই।’’
জনগণের কাছে জেলা প্রশাসক ‘গরিবের বন্ধু’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। মানুষ আমাকে কীভাবে দেখবে সেটা মানুষের বিষয়। কোনো কিছুর প্রত্যাশা নিয়ে আমি কাজ করি না। নিজের সন্তুষ্টির জন্য অসহায় মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। তাদের যদি উপকার হয় তাতেই আমি খুশি। মানুষের কল্যাণ হলে আমার সময়টা কাজে লাগলো। আমি সন্তুষ্ট।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









