‘‘মৃত্যু পান করে আমি পাথর হয়ে ছিলাম
আবার পুঁই মেলেছি তরু লতায়,
গাছটি আবার ঢলেছি মৃত্যুর শয়ানে
আবার এসেছি একটি প্রাণীর খাঁচায়
জীবটি আমি লুকিয়েছি ফের মরণের অন্তঃপুরে
ফিরেছি আবার মানুষের রূপ ধরে।
কেন ভয়, কিসের ডরে আঁখি করে ছলোছলো
মৃত্যু আমার কী কেড়ে নিয়েছে বলো?’’
আলেম থেকে কবি। বাল্খ থেকে কোনিয়া। শামস তাবরিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ থেকে গভীর বিচ্ছেদ। আর সেই বিচ্ছেদ থেকে জন্ম নেওয়া প্রেম, নৃত্য ও কবিতা। তার আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রে ছিল গভীর উপলব্ধি—স্রষ্টা, সৃষ্টি ও প্রেমকে আলাদা করে দেখা যায় না। প্রেমই মানুষকে তার উৎসের দিকে ফিরিয়ে নেয়। আর এই উপলব্ধির বাহক জালালউদ্দিন রুমি।
বাঁশি কাঁদছে। তার কান্না কোনো মানুষের জন্য নয়, কোনো হারানো ঘরের জন্যও নয়। তার কান্না বিচ্ছেদের।
জালালউদ্দিন রুমির ‘মসনবি’ শুরু হয় সেই বাঁশির আর্তনাদ দিয়ে। বাঁশিটি কাটা পড়েছে তার নলখাগড়ার বন থেকে। তাই তার সুরে আছে ঘর হারানোর ব্যথা। সে এমন এক উৎসের কথা বলে, যেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তার বুকের ভেতর জন্ম নিয়েছে আকুলতা।
বাঁশিটি তাই কাঁদে। কারণ সে জানে, তার সুরের সৌন্দর্য তার নিজের নয়। কেউ একজন তাকে বাজাচ্ছে। আর মানুষের জীবনও হয়তো তেমনই—আমরা নিজেদের সুরের মালিক ভাবি, অথচ গভীর কোনো মুহূর্তে বুঝতে পারি, আমাদের সমস্ত প্রেম, সমস্ত আকুলতা, সমস্ত সৌন্দর্যবোধ আসলে একটি বৃহত্তর সুরের দিকে ইঙ্গিত করছে।
রুমির আধ্যাত্মিকতা বোঝার জন্য এই বাঁশির গল্প সুন্দর দরজা। মানুষও কি এমন নয়? আমরা নিজেদের আলাদা ভাবি—আমি আলাদা, পৃথিবী আলাদা, স্রষ্টা আলাদা। কিন্তু রুমির কাছে এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতিই মানুষের মূল দুঃখ। প্রেম সেই দুঃখের মধ্য দিয়ে পথ খুলে দেয়। মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার মধ্যে সে আসলে এমন এক সৌন্দর্যের সন্ধান করে, যার উৎস আরও গভীরে। শেষ পর্যন্ত সব ভালোবাসাই তাকে সেই এক পরম প্রিয়ের দিকে ফিরিয়ে নিতে পারে।
রুমি ছিলেন ত্রয়োদশ শতকের মানুষ। ১২০৭ সালে তৎকালীন পারস্যের বাল্খে তার জন্ম। বাবা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন খ্যাতিমান ধর্মতাত্ত্বিক ও প্রচারক। মঙ্গল আগ্রাসনের সময় পরিবারটি বাল্খ ছেড়ে পশ্চিমের দিকে চলে গিয়ে দীর্ঘ যাত্রার পর তারা আনাতোলিয়ার (তুরস্ক) কোনিয়ায় বসতি স্থাপন করেন। সেখানেই পিতার উত্তরসূরি হয়ে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন রুমি।
তখন তিনি কবি নন আলেম। তার চারপাশে ছাত্র, অনুসারী ও ধর্মীয় আলোচনা। কোরআন, হাদিস, ইসলামি আইন ও দর্শন—জ্ঞানচর্চাই তার জীবনের কেন্দ্র।
অতঃপর ১২৪৪ সাল...
কোনিয়ায় এলেন এক ভবঘুরে দরবেশ—শামসউদ্দিন তাবরিজি। এই সাক্ষাৎ রুমির জীবনকে এমনভাবে বদলে দিল, যার তুলনা তার নিজের জীবনে আর নেই।
শামস প্রচলিত অর্থে কোনো শিক্ষক নন। কিন্তু রুমির সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব দ্রুত গভীর হয়ে ওঠে। তারা দীর্ঘ সময় কথা বলতেন, একসঙ্গে থাকতেন, আধ্যাত্মিক সাধনা ও জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতেন। রুমির চারপাশের মানুষ এই সম্পর্ককে সহজভাবে নেয়নি। শামস একসময় কোনিয়া ছেড়ে চলে যান। তবে আবার ফিরে আসেন কিছুদিনের জন্য এরপর কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। তার শেষ পরিণতি নিয়ে নানা কাহিনি ও কিংবদন্তি আছে; তবে নিশ্চিত যে তার অনুপস্থিতি রুমির জীবনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছিল।
সেই শূন্যতা থেকেই যেন বেরিয়ে এল কবিতা...
রুমি শামসকে খুঁজতে দামেস্ক পর্যন্ত গিয়েছিলেন বলে পরবর্তী জীবনীকারদের বর্ণনায় পাওয়া যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝলেন, যাকে বাইরে খুঁজছেন, তার একটি আলো নিজের ভেতরেই জ্বলে উঠেছে। শামস তখন আর শুধু একজন মানুষ নন—তিনি হয়ে উঠেছেন রুমির কাছে এক আধ্যাত্মিক প্রতীক।
রুমির জীবনীকারদের মধ্যে অন্যতম মোহাম্মদ আমিন রাহি তাবরেজির ফিরে আসা ও নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সম্পর্কে জানান, ১২৪৬ সালে শামস একবার কনিয়া ছেড়ে চলে গেলে রুমির পুত্র সুলতান ওয়ালাদ তাকে ফিরিয়ে আনেন। পরের বছর, ১২৪৭ সালে শামস আবারও অন্তর্ধান করেন—এবার আর ফিরে আসেননি।
তাই শামসের নামে রচনা করলেন গজলসম্ভার ‘দিওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজি’। বিচ্ছেদের শোককে অতিক্রম করে স্রষ্টার সন্ধানে পরিণত হয়। এখানে রুমির দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়— ‘বিচ্ছেদই কখনো কখনো মিলনের আকাঙ্ক্ষা জাগায়।’ রুমির কাছে মানুষের সমস্যা কেবল অস্তিত্বের নয় বরং স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করা। আমরা ভাবি, ‘আমি আছি’। কিন্তু রুমি বারবার মনে করিয়ে দেন—‘আমাদের অস্তিত্ব ধার করা। পরম অস্তিত্ব একমাত্র স্রষ্টার।’
তার দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রুমি-গবেষক উইলিয়াম চিটিক দেখিয়েছেন, রুমির তাওহিদের ধারণার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক সরাসরি।
শামস তাবরিজির ভাষ্যে, ‘‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই’’—এই উপলব্ধির পাশাপাশি মানুষকে নিজের অহংকার ও পৃথক অস্তিত্বের দাবিকেও অতিক্রম করতে হয়। রুমির ভাষায়, ‘‘প্রেম সেই কাজটি করে। প্রেমের আগুন জ্বলে উঠলে স্রষ্টার ছাড়া অন্য সবকিছুর প্রতি আত্মকেন্দ্রিক আসক্তি পুড়ে যায়।’’
রুমির প্রেম নিছক মানব প্রেম নয়…
তিনি অবশ্য মানবিক প্রেমকে অস্বীকার করেননি বরং মানুষের ভালোবাসাকেই তিনি একটি সেতু হিসেবে দেখেছেন। কোনো মানুষ, সৌন্দর্য, মুখ, ফুল— কেন আমাদের এত গভীরভাবে টানে? কারণ তার মধ্যে আমরা সৌন্দর্যের ঝলক দেখি। কিন্তু ঝলক আর সূর্য এক নয়।
রুমি একাধিক জায়গায় পৃথিবীর সৌন্দর্যকে প্রতিবিম্বের সঙ্গে তুলনা করেন। জলের মধ্যে চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। জলে ঢেউ ওঠে, ভেঙে যায় প্রতিবিম্ব; কিন্তু চাঁদ রয়ে যায়। তেমনি পৃথিবীর মানুষ ও বস্তুতে আমরা যে সৌন্দর্য দেখি, তার গভীরে আছে স্রষ্টার গুণাবলির প্রতিফলন। রুমির কাছে মানুষের ভালোবাসা তাই অনেক সময় একটি ‘ছায়া’; সেই ছায়াকে অনুসরণ করতে করতেই মানুষ সত্যিকারের আলোর কাছে পৌঁছাতে পারে।
এ কারণেই তার কাছে সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে এক করে ফেলা যেমন ভুল, তেমনি তাদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাবাও ভুল। সৃষ্টি স্রষ্টা নয়; কিন্তু সৃষ্টির প্রতিটি অস্তিত্ব তার ওপর নির্ভরশীল এবং তার গুণের কোনো না কোনো আভাস বহন করে। সবকিছু এক উৎস থেকে আসে এবং শেষ পর্যন্ত সেই উৎসের দিকেই ফিরে যায়—রুমির চিন্তায় এই ‘আসা-ফিরে যাওয়া’ একটি মৌলিক ধারণা।
এই ফিরে যাওয়ার পথটির নাম প্রেম…
রুমির একটি বিখ্যাত ধারণা হলো—প্রেম এমন আগুন, যা জ্বলে উঠলে ‘চিরন্তন প্রিয়তম’ ছাড়া সবকিছুকে পুড়িয়ে ফেলে। পুড়িয়ে ফেলা মানে পৃথিবী ধ্বংস নয়; বরং মানুষের অহংকার, মালিকানাবোধ ও ‘আমি-ই কেন্দ্র’ এই ভ্রমকে শেষ করা।
সুফি সাধনায় এর সঙ্গে যুক্ত ‘ফানা’—অহংয়ের বিলোপ। ‘আমি’ যে নিজেই নিজের চূড়ান্ত সত্য—এই দাবির অবসান। তিনি এ জন্য ‘শূন্যতা’র কথা বলেন। একটি গল্পে তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা বলেন, যে নবী ইউসুফের (আঃ) অপরূপ সৌন্দর্যের কথা শুনে বহু দূর থেকে তার কাছে আসেন। উপহার হিসেবে নিয়ে যান একটি আয়না। ইউসুফ (আঃ) সেই আয়নায় নিজের সৌন্দর্য দেখতে পারবেন।
রুমি গল্পটির শেষে প্রশ্ন করেন—‘‘অস্তিত্বের আয়না কী?’’, ‘অস্তিত্বহীনতা’ বা নিজের অহংকারহীনতা। অর্থাৎ মানুষ যখন নিজের ‘আমি’কে আয়না থেকে সরিয়ে দেয়, তখনই সেখানে অন্যের সৌন্দর্য প্রতিফলিত হতে পারে। রুমির আরেকটি শিক্ষা হলো—জ্ঞান দরকার, কিন্তু কেবল বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়।
এখানেও তার জীবন যেন তার দর্শনের উদাহরণ। তিনি ছিলেন অসাধারণ পণ্ডিত। কিন্তু শামসের সাক্ষাতের পর তার জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হলো অভিজ্ঞতা, প্রেম ও আত্মরূপান্তর। রুমি বুদ্ধিকে অস্বীকার করেননি। বরং তিনি বুদ্ধির নানা স্তরের কথা বলেছেন। তার মতে, ‘‘এমন জ্ঞান আছে যা কেবল তথ্য দেয়, আবার এমন জ্ঞান আছে যা মানুষকে বদলে দেয়।’’ প্রথমটি ‘আলো’ সম্পর্কে কথা বলে; দ্বিতীয়টি মানুষকে সেদিকে নিয়ে যায়।
তার বিখ্যাত গল্প ‘মূসা ও রাখাল’ এই দর্শনের অসাধারণ উদাহরণ। ‘‘এক রাখাল স্রষ্টার কাছে অতি সরলতা নিয়ে প্রার্থনা করছিল। সে স্রষ্টাকে যেন একজন মানুষের মতো কল্পনা করে বলছিল—তার চুল আঁচড়ে দেবে, কাপড় ধুয়ে দেবে, দুধ খাওয়াবে। নবী মূসা (আঃ) সেই প্রার্থনা শুনে তাকে ভর্ৎসনা করেন। বলেন, ‘এভাবে স্রষ্টাকে কল্পনা করা ভুল।’ রাখাল দুঃখ পেয়ে; চুপ হয়ে যায়। তারপর সৃষ্টিকর্তা মূসাকে সতর্ক করেন—‘তুমি কেন আমার বান্দাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিলে?’ তার ভাষা তোমার কাছে ভুল হতে পারে, কিন্তু তার হৃদয়ের আকুলতা সত্য।
রুমি এখানে ধর্মীয় আচারকে বাতিল করেন না; তিনি দেখান, আচার ও ভাষার ওপরে আছে অন্তরের সত্যতা। গল্পের কেন্দ্রে তিনি লিখেছেন, ‘প্রেমিকদের ধর্ম আলাদা; তাদের একমাত্র মত ও বিশ্বাস খোদা।’
এই গল্পের জনপ্রিয়তা আজ অনেক বেশি, কারণ এটি ধর্মীয় সহিষ্ণুতার একটি সুন্দর প্রতীক। কিন্তু রুমির উদ্দেশ্য আরও গভীর। তিনি বলতে চান, ‘খোদার দিকে যাত্রা কেবল বাহ্যিক ভাষা, পরিচয় বা জ্ঞানের প্রদর্শন নয়; হৃদয়ের রূপান্তরও তার অপরিহার্য অংশ।’ তাই রুমির কবিতায় হৃদয় প্রায়ই একটি আয়না। অহংকার, লোভ, হিংসা, আত্মমুগ্ধতা সেই আয়নায় মরচে জমায়। প্রেম সেই মরচে ঘষে তুলে দেয়। তখন হৃদয় পৃথিবীর সৌন্দর্যকে শুধু বস্তু হিসেবে দেখে না; তার মধ্যে উৎসের আভাস দেখতে শেখে।
রুমির কাছে ব্যথারও একটি বিশেষ মূল্য আছে। বিচ্ছেদ, ব্যর্থতা, আকুলতা—এসবকে তিনি কেবল দুঃখ হিসেবে দেখেননি। ব্যথা মানুষকে তার প্রয়োজনের কথা মনে করিয়ে দেয়। যে মানুষ সম্পূর্ণ তৃপ্ত, সে হয়তো নিজের উৎসের কথা ভুলে থাকতে পারে। কিন্তু তৃষ্ণার্ত মানব জল খোঁজে। রুমির ভাষায়, ‘‘প্রেমিকের আসল পরিচয় তার ‘পূর্ণ তৃষ্ণা’।’’ এই কারণেই তার কবিতায় আগুন ও পানির পাশাপাশি অবস্থান। একদিকে দহন, অন্যদিকে জীবনের জল। বিচ্ছেদ যেমন কাঁদায়, তেমনি সেই কান্নাই মানুষকে প্রিয়তমের দিকে ফিরিয়ে দেয়।
‘মসনবি’ এই দর্শনের সবচেয়ে বড় কাব্যিক ভুবন। ছয় খণ্ডের এই বিপুল রচনায় গল্পের পর গল্প, উপকথা, ধর্মতত্ত্ব, হাস্যরস, প্রেম, কামনা, অহংকার, মৃত্যু—সব একসঙ্গে প্রবাহিত হয়েছে। এটি কোনো সরল দার্শনিক গ্রন্থ নয়; বরং গল্পের ভেতর দিয়ে আত্মার শিক্ষা। রুমি নিজে এটি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। ১২৭৩ সালে তার মৃত্যুর সময়ও ‘মসনবি’ তার আধ্যাত্মিক যাত্রার চলমান দলিল হয়ে ছিল।
এখানেই বিস্ময়। যে মানুষ একসময় ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠিত আলেম, শামসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল গান, কবিতা, নৃত্য। তার নামের সঙ্গে পরে যুক্ত হলো ঘূর্ণায়মান দরবেশদের নৃত্য—‘সামা’। ঘূর্ণনের মধ্যে যেন শরীর পৃথিবীর সঙ্গে, আর আত্মা তার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে। রুমির মৃত্যুর পর তার পুত্র সুলতান ওয়ালাদ মেভলোভি সুফি ধারার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
রুমির জীবনাবসান…
১২৭৩ সালের ডিসেম্বরে কোনিয়ায় ইহলোকের যাত্রা শেষ করেন রুমি। তার শেষযাত্রায় মুসলমানদের পাশাপাশি খ্রিষ্টান ও ইহুদিরাও এসেছিলেন—এমন বর্ণনা পরবর্তী রুমি-ঐতিহ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাকে যারা ভালোবাসত, তাদের কাছে মৃত্যু বিচ্ছেদ নয়; প্রিয়’র সঙ্গে মিলনের রাত। রুমির কাছে তাই মৃত্যু অনেক সময় ‘শব-ই আরুস’—বিয়ের রাতের মতো, যেখানে আত্মা তার উৎসের দিকে ফিরে যায়।
রুমির আধ্যাত্মিকতার সবচেয়ে গভীর কথাটি হয়তো সেখানেই— ‘ভালোবাসা মানুষকে অন্য কারও কাছে নিয়ে যায় না শুধু; ভালোবাসা মানুষকে তার নিজের উৎসের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।’ আর সেই প্রত্যাবর্তনের পথেই সৃষ্টি ধীরে ধীরে চিনতে শেখে তার স্রষ্টাকে—এবং নিজের ভেতরকার সেই আলোকে, যাকে এতদিন সে আলাদা বলে ভেবেছিল।
আজকের পৃথিবীতে রুমি কখনো প্রেমের কবি, কখনো আধ্যাত্মিক গুরু, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উদ্ধৃতির ‘রাজা’। তার কয়েকটি পঙ্ক্তি এতবার উদ্ধৃত হয়েছে যে কখনো কখনো মূল দর্শনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কই হারিয়ে যায়।
কিন্তু রুমিকে বুঝতে হলে তার জনপ্রিয় কয়েকটি বাক্যের বাইরে যেতে হয়। তিনি এমন কোনো সহজ সুখের দর্শন দেননি, যেখানে প্রেম মানেই সবকিছু সুন্দর।
স্রষ্টা, সৃষ্টি ও প্রেম—এই তিন রুমির জগতে বিচ্ছিন্ন ধারণা নয়। স্রষ্টা হলেন উৎস। সৃষ্টি সেই উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা এক দীর্ঘ সুর। আর প্রেম হলো সেই সুরের মধ্যে ফিরে আসার আকুলতা।
উপমহাদেশের কবি ও সুফি-চিন্তক আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল রুমিকে শুধু একজন কবি হিসেবে দেখেননি; তাকে নিজের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বা ‘পীর’ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ইকবালের কাছে রুমি ছিলেন এমন এক গুরু, যার মাধ্যমে আত্মজাগরণ, প্রেম ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার পথ খুঁজে পাওয়া যায়। ইকবালের রুমিবিষয়ক শ্রদ্ধার একটি সুন্দর দিক হলো—তিনি রুমির মসনবিকে কোরআনের গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের ফারসি ব্যাখ্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার কাছে রুমি ছিলেন এমন একজন পথপ্রদর্শক, যিনি জ্ঞানকে কেবল বইয়ের মধ্যে রাখেননি; তাকে জীবন্ত আত্মিক অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছিলেন।
রুমির প্রতি পরবর্তী সুফি সাধকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে—রুমি শুধু একজন কবি নন; তিনি প্রেম, আত্মজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের একজন মহান শিক্ষক। তার কবিতা তাই শুধু পড়ার বিষয় নয়; বহু সুফির কাছে তা ছিল অন্তরের যাত্রার একটি পথ।
ইবনে আরাবির অন্যতম প্রধান শিষ্য সদরুদ্দিন কুনাভির সঙ্গে রুমির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় রুমি সম্পর্কে বলেন—আজ যদি বায়েজিদ বোস্তামি ও জুনায়েদ বাগদাদি জীবিত থাকতেন, তারা রুমির আধ্যাত্মিক মর্যাদা স্বীকার করে তার সঙ্গ গ্রহণ করতেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









