রাত তখন গভীর। চারদিকে নিস্তব্ধতা। ঘুমিয়ে ছিল পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার হিন্দু অধ্যুষিত আঙ্গুলকাটা গ্রাম। হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে গ্রামে ঢুকে পড়ে একদল সশস্ত্র মানুষ। ঘুমন্ত মানুষের ঘরে ঘরে শুরু হয় তল্লাশি। আতঙ্কে দরজা খুলে বাইরে আসতে হয় অনেককে। একে একে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ৩৭ জন হিন্দু বাঙালিকে।
১৯৭১ সালের ৬ অক্টোবরের সেই রাতটি মঠবাড়িয়ার মানুষের কাছে আজও এক ভয়াবহ স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সহযোগিতা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ার কারণে ওই গ্রামে হামলা চালানো হয়েছিল বলে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানান।
সেদিন রাতে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি সশস্ত্র দল আঙ্গুলকাটা গ্রামে হানা দেয়। ধরপাকড়ের পাশাপাশি চলে লুটপাট। ঘুমন্ত অবস্থায় বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া ৩৭ জনকে প্রথমে মঠবাড়িয়া থানায় আটকে রাখা হয়। তাঁদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। পরে সাতজনকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বাকি ৩০ জনের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও ভয়ংকর পরিণতি।
রাত পেরিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় মঠবাড়িয়া শহর থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরের সূর্যমণি এলাকার ওয়াপদা বেড়িবাঁধে। সেখানে তাঁদের একসঙ্গে দাঁড় করানো হয়। এরপর চালানো হয় গুলি।
মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষগুলোর সামনে তখন পালানোর কোনো পথ ছিল না। একসঙ্গে গুলিতে লুটিয়ে পড়েন অনেকে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই হত্যাযজ্ঞে ২৫ জন প্রাণ হারান। গুলিবিদ্ধ হয়েও পাঁচজন কোনোভাবে বেঁচে যান।
প্রকাশিত বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা ২৪ জনও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে পালিত সূর্যমণি গণহত্যা দিবস এবং শহীদ পরিবারের বর্ণনায় ২৫ জনের নামই স্মরণ করা হয়। সংখ্যার এই পার্থক্য থাকলেও হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা নিয়ে স্থানীয় ইতিহাসে কোনো সংশয় নেই।
একটি রাতেই নিঃস্ব হয়ে যায় বহু পরিবার। যে মানুষগুলো সন্ধ্যায় স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তাদের অনেকেই আর ভোরের আলো দেখেননি। কোনো মা হারিয়েছেন সন্তান, কোনো স্ত্রী হারিয়েছেন স্বামী, কোনো সন্তান হারিয়েছে বাবা। আঙ্গুলকাটা গ্রামের সেই রাত তাই শুধু একটি গণহত্যার ঘটনা নয়; এটি কয়েকটি পরিবারের প্রজন্মজুড়ে বয়ে চলা এক শোকের ইতিহাস।
সূর্যমণির বেড়িবাঁধ আজও সেই হত্যাযজ্ঞের নীরব সাক্ষী। সময়ের সঙ্গে চারপাশ বদলে গেছে, বদলে গেছে মানুষের জীবন। কিন্তু যে মাটিতে সেদিন নিরস্ত্র মানুষের রক্ত ঝরেছিল, সেই মাটি মঠবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে আছে।
প্রতি বছর ৬ অক্টোবর এলেই শহীদদের স্বজনেরা ফিরে যান সেই স্থানে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৭১-এর সেই রাত। কেউ স্মরণ করেন বাবাকে, কেউ ভাইকে, কেউ স্বামীকে। ৫৫ বছর পরও তাঁদের কাছে প্রিয়জন হারানোর সেই ক্ষত শুকায়নি।
শহীদদের স্মরণে সূর্যমণিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বধ্যভূমিটি অরক্ষিত থাকার পর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তবে তাঁদের আক্ষেপ, স্বাধীনতার এত বছর পরও শহীদ পরিবারগুলোর অনেকে যথাযথ স্বীকৃতি পাননি।
শহীদ পরিবারের সদস্য বিকাশ চন্দ্র হালদার বলেন, তাদের স্বজনেরা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। তাদের স্মৃতি যেন হারিয়ে না যায় এবং শহীদ পরিবারগুলো যথাযথ স্বীকৃতি পায়—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সূর্যমণি গণহত্যা দিবস উপলক্ষে মঠবাড়িয়া শহর থেকে শোকযাত্রা বের হবে। প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ পেরিয়ে শোকযাত্রাটি সূর্যমণি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে যাবে। সেখানে শহীদ বেদিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে। মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা এতে অংশ নেবেন। পরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদেও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতি বছর ৬ অক্টোবর সূর্যমণির পথে মানুষের পা পড়ে। শহীদ বেদি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। শ্রদ্ধায় নত হয় মাথা। কিন্তু ফুলের নিচে চাপা পড়ে না ১৯৭১-এর সেই নির্মমতার স্মৃতি।
একটি রাত। ৩৭ জন মানুষ। সাতজন ফিরে এলেন, পাঁচজন বেঁচে গেলেন; আর ২৫টি পরিবার হারাল তাদের প্রিয়জন। ৫৫ বছর পরও সেই হিসাব মেলেনি স্বজনদের জীবনে। কারণ ইতিহাসের পাতায় একটি সংখ্যা যতই ছোট হোক, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি জীবন আর অসংখ্য মানুষের কান্না।
সূর্যমণির বেড়িবাঁধ তাই শুধু একটি গণহত্যার স্থান নয়—এটি স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়া সেই মানুষগুলোর শেষ ঠিকানা। তাঁদের রক্তের দাগ সময় মুছে ফেলতে পারেনি। মুছে ফেলতে পারেনি স্বজনদের বুকের ভেতর জমে থাকা সেই রাতের কান্নাও।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









