যে বীরের বুকের রক্তে লেখা হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, যার অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে জাতি তাকে দিয়েছিল সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’—সেই শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে এবার পরানো হলো জুতোর মালা। ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে এমন দৃশ্য দেখা যায়। মুক্তিযুদ্ধের এই বীরের স্মৃতির প্রতি এমন অবমাননাকর ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন জেলাবাসী। মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারাও জানিয়েছেন তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ছবিটি নজরে আসার পর সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কামালুজ্জামান ঘটনাস্থলে যান। সেখানে ভাস্কর্যের গলায় জুতোর মালা ঝোলানো অবস্থায় দেখতে পান। পরে তিনি সেটি অপসারণ করেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানোর পাশাপাশি ঝিনাইদহ সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার উদ্যোগ নেন।
কামালুজ্জামান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে ভাস্কর্যে জুতোর মালা পরানো দেখতে পাই। পরে সেটি অপসারণ করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। এ ঘটনায় থানায় জিডি করছি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু ঝিনাইদহের নয়, পুরো বাংলাদেশের গর্ব। মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করে তিনি যে বীরত্বের ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তা জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তার নামে নির্মিত স্থাপনা ভাঙার ঘটনার পর ভাস্কর্যে জুতোর মালা পরানোর ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, ভাস্কর্যটিতে বারবার হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। তাঁর দাবি, কোনো একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। সর্বশেষ জুতোর মালা পরানোর ঘটনাটিও তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ঝিনাইদহ জেলা কমিটিও।
জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু তোয়াব অপু বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতোর মালা পরিয়ে অবমাননার ঘটনা অত্যন্ত ঘৃণ্য। তিনি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তার অভিযোগ, এর আগে ভাস্কর্য ও চত্বরে হামলা-ভাঙচুরের ধারাবাহিকতায় নতুন করে এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে বিকেলে প্রতিবাদ কর্মসূচির আহ্বান করেন।
জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। রাতে কে বা কারা এ ন্যক্কারজনক কাজ করেছে, তা খুঁজে বের করা হবে।’ তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ১৭ জুলাই ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে নির্মিত চত্বর অপসারণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে ঝিনাইদহ পৌরসভা চত্বরটি অপসারণের কাজ শুরু করেছিল। তখন ভাস্কর্য নির্মাণ-সংক্রান্ত প্রকল্পের মূল ফাইল খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে।
চত্বর অপসারণ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এবার ভাস্কর্যে জুতোর মালা পরানোর ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কে বা কারা রাতের আঁধারে এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের জন্য সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। তাদের অন্যতম শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই বীরের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
সেই বীরের ভাস্কর্যে জুতোর মালা পরানোর ঘটনায় তাই ক্ষোভ শুধু একটি স্থাপনা অবমাননার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও শহীদ বীরদের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা। ঝিনাইদহবাসীর প্রত্যাশা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









