গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সচিব (যুগ্মসচিব) মো. আবদুস সবুর। তিনি বলেছেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা কোনো বাধা, প্রতিবন্ধকতা বা আইনগত জটিলতার মুখে পড়লে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল তাদের পাশে থাকবে। তবে কোনো সাংবাদিক ব্যক্তিগতভাবে ফৌজদারি অপরাধে জড়ালে তার দায় প্রেস কাউন্সিল বা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নেবে না।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সকালে যশোর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের উদ্যোগে এবং যশোর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব ও অধিকার বিষয়ক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন।
আবদুস সবুর বলেন, সাংবাদিকদের শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করে তাদের নিয়োগপত্র দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক সাংবাদিককে পরিচয়পত্র দিতে হবে। নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র থাকলে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আইনগত অবস্থান আরও শক্ত হয়।
তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য সংগ্রহে গেলে সাংবাদিককে প্রথমে নিজের পরিচয়পত্র দেখিয়ে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে হবে। এরপর কী তথ্য, সংবাদ, উপাত্ত বা ইনফরমেশন প্রয়োজন তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানাতে হবে। তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যক্তি ওই তথ্য দেওয়া সম্ভব কি না তা বিবেচনা করে সাংবাদিককে জবাব দেবেন। তথ্য দেওয়া সম্ভব না হলে কী কারণে দেওয়া যাচ্ছে না, সেটিও জানানো উচিত।
তিনি বলেন, তথ্য অধিকার আইনে কোন কোন তথ্য পাওয়া যাবে এবং কোন কোন তথ্য পাওয়া যাবে না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। একজন সাংবাদিকের জন্য এসব বিষয় জানা অত্যন্ত জরুরি। শুধু কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছে গিয়ে পরিচয় দেওয়ার পর তথ্য না পেলেই বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ বা সংবাদ করা সমীচীন নয়।
সাংবাদিক ও প্রশাসনের সম্পর্কের বিষয়ে প্রেস কাউন্সিলের সচিব বলেন, প্রশাসন সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ নয়। প্রশাসন জনগণের সেবার জন্য কাজ করে, সাংবাদিকরাও জনগণের সেবার জন্য কাজ করেন। তাই দুই পক্ষের কাজের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। একইভাবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ বা শত্রু হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তিনি বলেন, কোনো সাংবাদিক সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দুর্নীতি, জালিয়াতি বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড দেখতে পেলে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পারেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তখন সাংবাদিক অনুসন্ধান ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনতে পারেন। এতে প্রশাসন ও গণমাধ্যম উভয়ের কাজের পরিবেশ আরও কার্যকর হতে পারে।
কপি-পেস্ট সাংবাদিকতার বিষয়ে সতর্ক করে আবদুস সবুর বলেন, একই সংবাদ এক পত্রিকা থেকে আরেক পত্রিকায় হুবহু প্রকাশ করার প্রবণতা থেকে সাংবাদিকদের বেরিয়ে আসতে হবে। নিজের মেধা, শ্রম ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে সংবাদ তৈরি করতে হবে। অন্যের মেধা বা লেখা হুবহু কপি করে প্রকাশ করা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় কোনো বাধা, প্রতিবন্ধকতা বা আইনগত জটিলতার মুখোমুখি হলে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল তাদের পাশে থাকবে। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য না পেলে তথ্য কমিশনের কাছেও যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে কোনো সাংবাদিক ব্যক্তিগতভাবে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ভিন্ন। সে ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমন ঘটনায় প্রেস কাউন্সিল বা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান সাংবাদিককে দায়মুক্তি দেবে না।
এর আগে সংবাদপত্র প্রকাশের আইনগত প্রক্রিয়া তুলে ধরে আবদুস সবুর বলেন, ১৯৭৩ সালের ‘ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ঘোষণা ও নিবন্ধীকরণ) আইন’-এর বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি। সংবাদপত্রের মুদ্রাকর ও প্রকাশকের ঘোষণাপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আইনের ৭ ধারায় সংবাদপত্রের মুদ্রাকর ও প্রকাশকের ঘোষণার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নির্ধারিত ‘খ’ ফরমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সমক্ষে ঘোষণা দিতে হয়। এরপর ঘোষণাপত্র প্রামাণীকরণের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ঘোষণাপত্র প্রামাণীকরণে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রেস কাউন্সিলের প্রেস আপিল বোর্ডে আবেদন করতে পারেন। আবার ঘোষণাপত্র দেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তা প্রামাণীকরণে ব্যর্থ হলেও প্রেস আপিল বোর্ডে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বের পার্থক্য তুলে ধরে আবদুস সবুর বলেন, একই ব্যক্তি দুই পদে দায়িত্ব পালন করলেও দায়িত্বের ধরন অনুযায়ী পদটি বিবেচনা করতে হবে। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সময় তিনি জেলা প্রশাসক এবং আইন ও বিচারিক বিষয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঘোষণাপত্র প্রামাণীকরণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি।
সরকারি প্রশাসনে দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রশাসনে বিভিন্ন অর্গান ও ‘রুলস অব বিজনেস’ অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করা থাকে। কেউ এককভাবে দেশ পরিচালনা করেন না। কেউ কাজ করেন, কেউ তদারকি করেন। এখানে ক্যাডার বা নন-ক্যাডার, বিসিএস বা আইসিএস বিষয় নয়, মূল বিষয় হলো জনগণের স্বার্থে কাজ করা হচ্ছে কি না।
তিনি বলেন, একজন সাংবাদিক তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সঠিক থাকলে তার সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে পারেন না। আবার প্রত্যেক কর্মকর্তার নির্দিষ্ট অধিক্ষেত্র রয়েছে। একজন ইউএনও তার উপজেলার বাইরে, ডিসি তার জেলার বাইরে এবং একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার নির্ধারিত অধিক্ষেত্রের বাইরে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।
কোনো কর্মকর্তা সাংবাদিকের সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত আচরণ না করলে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি জানানো যেতে পারে উল্লেখ করে আবদুস সবুর বলেন, প্রত্যেক কর্মকর্তারই একটি নির্দিষ্ট ‘লাইন জব’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা সাংবাদিকের কথা না শুনলে সাংবাদিক তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে গিয়ে বিষয়টি জানাতে পারেন। এরপরও প্রয়োজন হলে প্রেসক্লাবে লিখিতভাবে জানানো যেতে পারে। প্রেসক্লাব সব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে না পারলেও সাংবাদিককে সহযোগিতা করবে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুজন সরকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা তথ্য অফিসের সিনিয়র তথ্য অফিসার রেজাউল করিম, তথ্য অফিসার এলিন সাঈদ, প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, সহ-সভাপতি আনোয়ারুল কবির নান্টু, সাধারণ সম্পাদক নূর ইসলাম, সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব মবিনুল ইসলাম মবিন, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের সভাপতি আকরামুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক এসএম ফরহাদ।
কর্মশালায় যশোরের বিভিন্ন উপজেলার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত ৪৫ জন তালিকাভুক্ত সাংবাদিক অংশ নেন। যশোর সদর, চৌগাছা, শার্শা, ঝিকরগাছা, কেশবপুর, মণিরামপুর, অভয়নগর ও বাঘারপাড়া উপজেলার সাংবাদিকরা প্রশিক্ষণে অংশ নেন।
অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের মধ্যে বাংলাভিশনের জেলা প্রতিনিধি রাজেক জাহাঙ্গীর, দৈনিক গ্রামের কাগজের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ফয়সল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার এসএম আরিফুজ্জামান ও স্বপ্না দেবনাথ, নতুন সকালের বার্তার স্টাফ রিপোর্টার তরিকুল ইসলাম তারেক, দৈনিক লোকসমাজের ফটো সাংবাদিক এম আর খান মিলন, স্টাফ রিপোর্টার মাসুদ রানা বাবু, দৈনিক সুবর্ণভূমির স্টাফ রিপোর্টার শাহারুল ইসলাম ফারদিন ও রায়হান সিদ্দিক, দৈনিক রানারের স্টাফ রিপোর্টার সালমান হাসান, দৈনিক আমাদের সময় ও দ্য বিজনেস পোস্টের যশোর প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম, দৈনিক লোকসমাজের স্টাফ রিপোর্টার আসিফুল হাসান, চ্যানেল ২৪-এর ক্যামেরাপারসন ইমরান হোসেন, ৭১ টিভির ক্যামেরাপারসন রাব্বী আল আমিন, চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরাপারসন ইমরান হোসেন রাজ, ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির ক্যামেরাপারসন শরিফ খান, নিউজ২৪-এর জেলা প্রতিনিধি হিমেল খান, বৈশাখী টিভির জেলা প্রতিনিধি মনিরুজ্জামান মনির, দৈনিক গ্রামের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার আশিকুর রহমান শিমুল ও পাপিয়া মল্লিক এবং দৈনিক লোকসমাজের মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ স্বদেশ সিংহসহ জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিকরা অংশ নেন।
দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে সাংবাদিকতার পেশাগত মান উন্নয়ন, গণমাধ্যমকর্মীদের অধিকার ও দায়িত্ব, তথ্য অধিকার আইন, সংবাদপত্র প্রকাশের আইনগত প্রক্রিয়া, সাংবাদিক ও প্রশাসনের পারস্পরিক সম্পর্ক, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং কপি-পেস্ট সাংবাদিকতা পরিহারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









