সাগরে স্বপ্নের নৌযান ডুবে গেছে। হারিয়েছেন ১৬ বছরের সন্তান আলবার্টকে। এরপর কক্সবাজারের একটি হোটেলে কেটেছে টানা ৫০ দিন। শোক, অনিশ্চয়তা আর নানা আনুষ্ঠানিকতার সেই দীর্ঘ অধ্যায় শেষে অবশেষে কক্সবাজার ছেড়েছে নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি৷
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে উড়োজাহাজে উঠেন ৭৪ বছর বয়সী জন এডওয়ার্ড পুডনি, তার স্ত্রী বেলা (৩৬) এবং ১৩ বছর বয়সী ছেলে রালফ। এর আগে বিকেল ৩টার দিকে পর্যটন মোটেল শৈবাল ছাড়েন তারা।
গত ২৫ আগস্ট সাগরে নৌযানডুবির পর জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিবারটিকে পর্যটন মোটেল শৈবালে রাখা হয়েছিল। সেখানেই কেটেছে তাদের শেষ ৫০ দিন।
বিদায়ের আগে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তোলেন পরিবারের সদস্যরা। কক্সবাজারের স্মৃতি ধরে রাখতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কিছু সময় কাটান তারা। বিকেল ৪টার দিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান পরিবারটিকে বিদায় জানান।
পর্যটন মোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিবারটির থাকার ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘ ৫০ দিন তারা হোটেলে ছিলেন। এ সময়ে খাবার, নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তারা ভালো পরিবেশে ছিলেন এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে ভালো ধারণা নিয়েই ফিরছেন। আমাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকায় তাদের সঙ্গে আমাদের হৃদ্যতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যাওয়ার সময় তাদের দেশীয় পণ্য উপহার দেওয়া হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড পুডনির স্বপ্ন ছিল সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণ করে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে প্রায় আড়াই বছর পরিশ্রম করে কাঠ দিয়ে তৈরি করেছিলেন ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের নৌযান।
নৌযানটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছিল দেড় কোটি টাকার বেশি। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর সেটিকে নিয়েই সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছিলেন তারা। কিন্তু প্রকৃতির বৈরিতা একের পর এক আঘাত হানে পরিবারটির ওপর।
গত ৭ এপ্রিল বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে মহেশখালী চ্যানেল অতিক্রমের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ‘আইল্যান্ড গার্ল’। পরে তারা সোনাদিয়া দ্বীপে আশ্রয় নেন। সেখানে রাতে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন। তাদের কাছ থেকে ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট, ডলারসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়। পরে কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে পরিবারটির সদস্যদের এবং লুট হওয়া অধিকাংশ মালামাল উদ্ধার করা হয়।
এর কয়েক মাস পর ২৫ আগস্ট নাজিরারটেক ও সোনাদিয়া দ্বীপের মধ্যবর্তী সাগরে আবারও দুর্ঘটনায় পড়ে নৌযানটি। এবার আর রক্ষা হয়নি তাদের স্বপ্নের ‘আইল্যান্ড গার্ল’। সাগরে ডুবে যায় কাঠের নৌযানটি।
কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা জন এডওয়ার্ড পুডনি, তার স্ত্রী বেলা ও ছোট ছেলে রালফকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও নিখোঁজ ছিল বড় ছেলে আলবার্ট। পরদিন বিকেল ৫টার দিকে সমিতিপাড়াসংলগ্ন সৈকত থেকে ১৬ বছর বয়সী আলবার্টের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আলবার্ট সাঁতার জানতেন না এবং তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছিলেন। নৌযানডুবির সময় তার লাইফ জ্যাকেটের ক্লিপ ঠিকভাবে আটকানো ছিল না বলে পরিবারের সদস্যদের ধারণা।
আলবার্টের মরদেহ উদ্ধারের পরও পরিবারের জন্য শেষ আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে সময় লাগে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ১৩ সেপ্টেম্বর মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে তা তার বাবা জন এডওয়ার্ড পুডনির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
১৫ সেপ্টেম্বর নিউজিল্যান্ড দূতাবাস ও পরিবারের সম্মতিতে কক্সবাজার শহরের একটি হিন্দু শ্মশানে আলবার্টের দাহ সম্পন্ন করা হয়।
এরপরও কক্সবাজার ছাড়তে পারেনি পরিবারটি। ভিসা, পাসপোর্ট ও বিমানের টিকিটসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে সময় লাগে আরও কয়েক সপ্তাহ।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, দুর্ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় পরিবারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। পরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি বলেন, গত ৭ অক্টোবর তাদের ফেরার কথা ছিল। কিন্তু পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমানের টিকিটসংক্রান্ত জটিলতার কারণে সেদিন তারা যেতে পারেননি। অবশেষে বুধবার তারা কক্সবাজার ছেড়েছেন। ভালো-মন্দ যে অভিজ্ঞতাই তাদের হয়ে থাকুক, তারা যেন নিরাপদে দেশে ফিরতে পারেন এবং সেখানে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনে পুরোপুরি ফিরতে পারেন এটাই আমাদের কামনা।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থার পুরো ব্যয়ও নথিভুক্ত করা হয়েছে। ১৩ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটন মোটেল শৈবালে তাদের কক্ষ, খাবার ও লন্ড্রি বাবদ মোট বিল হয়েছে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬২৭ টাকা।
এর মধ্যে এসি ডিলাক্স কক্ষের ভাড়ায় ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার পর বিল হয়েছে ২ লাখ টাকা। খাবারের বিল ২ লাখ ২১ হাজার ৫০৭ টাকা এবং লন্ড্রি বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ১২০ টাকা।
বিল পরিশোধের জন্য শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় অবস্থিত নিউজিল্যান্ড হাইকমিশনের কনস্যুলার অ্যান্ড প্রপার্টি কর্মকর্তা মিস নাদিসা ফার্নান্দোর কাছে তা পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
পরিবারটির নিরাপত্তায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন পুলিশ সদস্যরা। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দুজন পুলিশ সদস্য তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকতেন।
বুধবার ছিল সেই দায়িত্ব পালনের শেষ দিন। এদিন দায়িত্বে ছিলেন নায়েক রাহাত ও কনস্টেবল আবদুল কাদের।
নায়েক রাহাত বলেন, পরিবারের সদস্যরা কোথায় যাচ্ছেন, কেন বাইরে বের হচ্ছেন এসব বিষয় নজরে রাখতে হতো। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল দায়িত্ব।
তিনি বলেন, প্রথম দিকে তারা খুবই রূঢ় আচরণ করতেন। পরে ধীরে ধীরে সেই আচরণ কমে আসে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, পরিবারটি প্রায় দুই বছর ধরে কক্সবাজারে অবস্থান করছিল। পরে তারা নিজেদের তৈরি ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নৌযানেই বসবাস শুরু করে।
ভিসার মেয়াদসংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পরিবারটি সমুদ্রপথে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিল। সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য হয়ে ওঠে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









