একসময় এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল, কক্ষ আর উঠানজুড়ে ছিল এক পরিবারের স্মৃতি। চুন-সুরকির গাঁথুনি, কারুকার্যমণ্ডিত নকশা আর পুরোনো স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করে বাড়িটি আজও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সময়ের ক্ষয়, অযত্ন আর অবহেলায় সেই ঐতিহ্য এখন বিলীন হওয়ার পথে। কোথাও ছাদের অংশ ভেঙে পড়েছে, কোথাও দেয়ালে ফাটল। চারপাশে জমেছে ময়লা-আবর্জনা। অথচ এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপমহাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসের এক সাহসী নারী, নাচোল কৃষক বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রের স্মৃতি।
১৮ অক্টোবর তার জন্মশতবার্ষিকী। এমন একটি ঐতিহাসিক দিনে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামে অবস্থিত ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়িটি সংরক্ষণের দাবিই আবার সামনে এসেছে। প্রত্নসম্পদ হিসেবে বাড়িটি সংরক্ষণের সরকারি গেজেট প্রকাশের প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সাংস্কৃতিক কর্মী ও রাজনৈতিক নেতারা। পৈতৃকসূত্রে বাড়িটির বর্তমান মালিকদের দাবি, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে তারা বাড়িটি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ভাষ্য, জমি অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরও স্বীকার করেছে, ২০১৭ সালে গেজেট প্রকাশের পর বাড়িটি সেভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা রক্ষার প্রশ্নে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে দায়িত্বের প্রসঙ্গ উঠলেও বাস্তবে বাড়িটির অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
জরাজীর্ণ বাড়িতে ইতিহাসের স্মৃতি
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের বাগুটিয়া গ্রাম। গ্রামের জরাজীর্ণ, কর্দমাক্ত মেঠোপথের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি। পুরোনো স্থাপত্যের নিদর্শন বহনকারী বাড়িটি চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত। এতে রয়েছে একতলা ও দোতলা দুটি ভবন, মোট নয়টি কক্ষ এবং একটি প্রধান ফটক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১২৯৯ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ইলা মিত্রের দাদা রাজমোহন সেন বাড়িটি নির্মাণ করেন। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন বেঙ্গলের ডেপুটি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল। চাকরির সুবাদে ইলা মিত্রের জন্ম কলকাতায় হলেও শৈশবে কয়েকবার বাগুটিয়া গ্রামে এসেছিলেন তিনি। পাশের গোপালপুর, শেখরা, রঘুনন্দনপুর ও শাহাবাজপুর গ্রামেও তার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।

দেশভাগের পর তার পূর্বপুরুষেরা কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে পৈতৃক বাড়িটি তাদের হাতছাড়া হয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। বাড়িটির পাশাপাশি নগেন্দ্রনাথ সেনের রেখে যাওয়া শত শত বিঘা জমিও অন্যদের দখলে চলে যায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে বাড়িটির ১৭ শতক জমির ওপর নির্মিত দুটি ভবনে বসবাস করছেন হাজি কিয়াম উদ্দিনের চার সন্তান আলী হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুর রশিদ ও রাশিদুল ইসলাম। বাড়িটির বাসিন্দাদের দাবি, স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তি খোদাবক্স বাড়িটি কিনেছিলেন। পরে তার সূত্রে হাজি কিয়াম উদ্দিন মালিক হন। ১৯৭০ সাল থেকে কিয়াম উদ্দিনের উত্তরসূরিরা সেখানে বসবাস করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িটির একটি ভবনের ছাদের বড় অংশ ভেঙে পড়েছে। দেয়ালে ফাটল ধরেছে, চারপাশে জমেছে ময়লা-আবর্জনা। অযত্ন আর অবহেলায় ঐতিহাসিক স্থাপনাটির অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে। বাড়ির বাসিন্দারা প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তাদের বক্তব্য, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে তারা বাড়িটি ছেড়ে দেবেন। তাদের অভিযোগ, প্রতিবছর বিভিন্ন গণমাধ্যমের লোকজন এসে তাদের বিরক্ত ও হয়রানি করেন।
কৃষকের অধিকার আদায়ে যার সংগ্রাম
ইলা মিত্র কেবল একটি পরিবারের উত্তরাধিকার বহনকারী নন; তিনি বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। ভূমিহীন ভাগচাষি, বর্গাচাষি, সাঁওতাল আদিবাসী ও দরিদ্র কৃষকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি পরিচিতি পান ‘নাচোলের রানিমা’ হিসেবে।
জীবনীগ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, ইলা মিত্র কলকাতার বেথুন স্কুল ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং কলকাতা সিটি কলেজে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপনা করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি অবসর নেন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার নাচোল অঞ্চলে ঐতিহাসিক কৃষক বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন ইলা মিত্র। জমিদারি প্রথার অবসান, ফসলের ন্যায্য হিস্যা এবং কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ছিল তেভাগা আন্দোলন ও কৃষক সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আন্দোলনের সময় তার ওপর পুলিশি নির্যাতন চালানো হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে তিনি ঐতিহাসিক জবানবন্দি দেন। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর কারাগারে বন্দী থাকার পর প্যারোলে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান। নাচোল আন্দোলনে পুলিশ হত্যার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশের কারণে তার দেশে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে ভারতে স্থায়ী হলেও আজীবন রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
১৯৬২ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে চারবার মানিকতলা নির্বাচনী এলাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন ইলা মিত্র। ১৯৬৭ ও ১৯৭২ সালে বিধানসভায় কমিউনিস্ট দলের ডেপুটি লিডার ছিলেন। ১৯৬২ সাল থেকে আজীবন শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে পাঁচবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। ভারতের মহিলা ফেডারেশনের জাতীয় পরিষদ সদস্য, পশ্চিমবঙ্গ মহিলা সমিতির সহসভানেত্রী এবং ভারত-সোভিয়েত সাংস্কৃতিক সমিতির সহসভানেত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে।
ছাত্রজীবন থেকেই খেলাধুলা, গান, অভিনয় ও লেখাপড়ায় আগ্রহী ছিলেন ইলা মিত্র। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিকসে চ্যাম্পিয়ন হন। বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টন ও টেনিসেও দক্ষতা ছিল তার। ১৯৪০ সালে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বলে তার জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ওই অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং ভারত সরকারের স্বীকৃতি আদায়ে সোচ্চার ছিলেন তিনি। শিক্ষা, সংস্কৃতি, নারী অধিকার ও রাজনৈতিক আন্দোলনে তাঁর অবদান তাকে উপমহাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।

গেজেট হয়েছে, অধিগ্রহণ হয়নি
ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি সংরক্ষণের দাবি নতুন নয়। ২০১১ সাল থেকে সাংগঠনিকভাবে এ দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। ঝিনাইদহ, শৈলকুপা ও ঢাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
এসব আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে বাড়িটি পুরাকীর্তি ও প্রত্নসম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের তালিকাভুক্ত করা হয়। পরে ২০১৭ সালে বাড়িসহ ২২ শতাংশ জমিকে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ ঘোষণা করা হয়। ওই বছরের ৪ জানুয়ারি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় বাড়িটি সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু গেজেট প্রকাশের প্রায় এক দশক পরও জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়নি। স্থাপনাটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের কার্যকর উদ্যোগও দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কমরেড ইলা মিত্র স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুর রহমান মিল্টন বলেন, প্রায় আড়াই দশক ধরে তারা ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি রক্ষার আন্দোলন করছেন। কিন্তু এখনো বাড়িটি সংরক্ষণ করা হয়নি। তার অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা ও গাফিলতির কারণে উদ্যোগটি থমকে আছে। গেজেট প্রকাশের এত বছর পরও সেখানে একটি সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি। এর মধ্যে বাড়িটির কারুকাজ ও সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে স্থাপনাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে।
কমরেড ইলা মিত্র জন্মশতবর্ষ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক সুজন বিপ্লব বলেন, দেশভাগের পর ইলা মিত্রের পিতৃকুল কলকাতায় স্থায়ী হলে তাদের বিশাল বাড়ি ও জমিজমা হাতছাড়া হয়ে যায়। তার অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে বাড়িটির মালিকানা দাবি ও দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বাড়িটি অবিলম্বে দখলমুক্ত করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। দর্শনার্থীরা বাড়িতে গেলে গালিগালাজ করে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
সিপিবির ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু তোয়াব অপু বলেন, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ইলা মিত্রের ছবি থাকলেও তার নামে কোনো ভাস্কর্য বা পৈতৃক বাড়িতে সংরক্ষণাগার গড়ে ওঠেনি। অথচ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করা বাড়িটিতে তার রাজনৈতিক জীবন, কৃষক আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। সেখানে ইলা মিত্র গবেষণাগার বা সংরক্ষণাগার প্রতিষ্ঠা করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার জীবন ও আন্দোলন সম্পর্কে জানতে পারবে।
তিনি বলেন, জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অতীতেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন তারা। কিন্তু এত বছরেও পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ তৈরি হয়নি।
ঝিনাইদহের সাংস্কৃতিক কর্মী শারমিন জোয়ার্দ্দার বলেন, ইলা মিত্র নারীর অগ্রণী ভূমিকা এবং সমাজের মুক্তির জন্য সংগ্রামের শিক্ষা দিয়েছেন। তার জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়েও সেই আদর্শের সমাজ পুরোপুরি গড়ে তোলা যায়নি। একজন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে তিনি মনে করেন, ঐতিহাসিক এই বাস্তুভিটা রক্ষা করা জরুরি। আগামী প্রজন্মের জন্য বাড়িটি সংরক্ষণে সরকার ও এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বক্তব্য
ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন। তিনি বলেন, বাড়িটি সংরক্ষণের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। বিষয়টি নিয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবেন তিনি।
ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে স্থানীয়ভাবে কোনো আয়োজন না হওয়ার বিষয়েও জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দেখবেন তিনি।
শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঘোষণার পর বাড়িটির নিয়ন্ত্রণ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের হাতে চলে গেছে। জমি অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের বিষয়। এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না, তা তার জানা নেই।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম স্বীকার করেন, ২০১৭ সালে গেজেট প্রকাশের পর বাড়িটি সেভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। তবে নিয়মিত দেখাশোনা ও পরিচর্যা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
মহিদুল ইসলাম বলেন, বাড়িটি সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়ার আশা করছেন তারা। বাড়িটি বেদখল থাকার সমস্যাও রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। দ্রুত বাড়িটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
স্মৃতি রক্ষার অপেক্ষা
ইলা মিত্র ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। দরিদ্র কৃষক, সাঁওতাল আদিবাসী ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে তার সংগ্রাম তাঁকে ইতিহাসে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। অথচ তাঁর পৈতৃক বাড়িটি আজও অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।
স্থানীয়দের দাবি, বাড়িটি অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণাগার, জাদুঘর বা গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হোক। ইলা মিত্রের নামে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মিলনায়তন ও সড়কের নামকরণ এবং বাড়ি পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণের দাবিও দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন তারা।
জন্মশতবর্ষে এসে ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি ঘিরে প্রশ্নটি তাই আরও জোরালো—যে নারী কৃষক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তার স্মৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রের উদ্যোগ কোথায়? সরকারি গেজেট প্রকাশের পরও যদি একটি ঐতিহাসিক বাড়ি ধ্বংসের মুখে পড়ে থাকে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস পৌঁছাবে কীভাবে?
জমি অধিগ্রহণ, বর্তমান বাসিন্দাদের পুনর্বাসন এবং স্থাপনাটির সংস্কার—এই তিনটি বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত না এলে ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি হয়তো একসময় হারিয়ে যাবে। আর তার সঙ্গে মুছে যেতে পারে বাংলার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের দৃশ্যমান স্মারক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









