ঢাকের ছন্দে ছন্দে জেগে ওঠে ভক্তির আবেশ, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। ধূপের ধোঁয়া, মন্ত্রপাঠ আর পুষ্পাঞ্জলির ফুলে ফুলে ছড়িয়ে পড়ে শারদীয় উৎসবের স্নিগ্ধতা। শরতের সোনালি আবহে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এভাবেই নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে দুর্গোৎসবের মহাষ্টমী। আর এই উৎসবের আবহে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে বারঘরিয়ার প্রায় ৩২১ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাইশপুতুল দুর্গাপূজা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল থেকে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তদের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। চণ্ডীপাঠ, পূজা-অর্চনা ও পুষ্পাঞ্জলির মধ্য দিয়ে দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। বর্ণিল আলোকসজ্জায় সাজানো মণ্ডপে পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রতিমা দর্শনে বের হন দর্শনার্থীরা। মহাষ্টমীর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সন্ধিপূজা ও কুমারী পূজাকে ঘিরেও ছিল বিশেষ আগ্রহ।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাষ্টমীতে দেবী দুর্গার মহাগৌরী রূপের আরাধনা করা হয়। পুরাণে বর্ণিত আছে, অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে দেবী চামুণ্ডা রূপ ধারণ করে চণ্ড ও মুণ্ড নামের দুই অসুরকে বধ করেন। সেই পৌরাণিক ঘটনাকে স্মরণ করেই আয়োজন করা হয় সন্ধিপূজা। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণের নির্দিষ্ট ৪৮ মিনিটের মধ্যে এ পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়।
বাইশপুতুলে ইতিহাসের আলো
ধর্মীয় আচার আর উৎসবের রঙের বাইরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুর্গোৎসবে আলাদা এক আবেগের নাম বারঘরিয়ার বাইশপুতুল দুর্গাপূজা। ২২টি মূর্তির সমন্বয়ে আয়োজিত এই পূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস, পারিবারিক ঐতিহ্য, লোককথা ও মানুষের গভীর বিশ্বাস।
জেলা শহরের উপকণ্ঠ বারঘরিয়ায় অবস্থিত বাইশপুতুল সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে প্রতিবছর এ পূজার আয়োজন করা হয়। রাজশাহী অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব হিসেবে পরিচিত এ পূজা দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসেন অসংখ্য দর্শনার্থী।
মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক শ্রী মৃণাল কান্তি পাল জানান, আনুমানিক ১৭০৫ সাল থেকে বংশপরম্পরায় এ পূজা হয়ে আসছে। সেই হিসাবে ঐতিহ্যটির বয়স প্রায় ৩২১ বছর। একসময় চৌডালাকেন্দ্রিক ছিল পূজার আয়োজন। তার বর্ণনায় উঠে আসে এ পূজার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক লোককথা। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, একবার ভয়াবহ বন্যায় পুরো এলাকা প্লাবিত হলে দেবীর কাঠামোটি পানিতে ভেসে বারঘরিয়ার নদীর ঘাটে চলে আসে। পরে বারঘরিয়ার পূজারিরা স্বপ্নে দেবীর নির্দেশনা পাওয়ার কথা প্রচার করেন। এরপর থেকে বারঘরিয়াতেই পূজার আয়োজন হয়ে আসছে। কালের স্রোতে বদলেছে চারপাশ, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু বদলায়নি এই পূজাকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস ও আবেগ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে সেই ঐতিহ্যের ধারা। বাইশটি মূর্তির সমাহারে পূজার আয়োজন আজও স্মরণ করিয়ে দেয় অতীতের সঙ্গে বর্তমানের নিবিড় বন্ধন।
ঐতিহ্য যেখানে উৎসবের প্রাণ
দুর্গোৎসবের আনন্দ কেবল মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শন কিংবা আলোকসজ্জার সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভেতরে মিশে থাকে মানুষের মিলন, বিশ্বাসের প্রকাশ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলা সংস্কৃতির গল্প। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহাষ্টমী সেই চিরচেনা আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। আর বারঘরিয়ার বাইশপুতুল দুর্গাপূজা সেই উৎসবে যোগ করে ইতিহাসের অনন্য মাত্রা। ঢাকের বাদ্য থেমে যাবে, উৎসবের আলো একসময় নিভে আসবে, দর্শনার্থীরাও ফিরবেন আপন ঠিকানায়। কিন্তু ৩২১ বছরের ঐতিহ্য, লোককথা আর ভক্তির যে গল্প বাইশপুতুল দুর্গোৎসব বয়ে চলেছে, তা থেকে যাবে মানুষের স্মৃতিতে। শরতের আকাশের মতোই নির্মল সেই গল্প—যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে আছে বাংলার লোকঐতিহ্য, আর অতীতের শিকড় ধরে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









