সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী অ্যান কারসনের গদ্যের বই ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট: অ্যান এসে’ থেকে ‘মাই পেইজ মেইকস লাভ’ প্রবন্ধটি দৈনিক এদিন অনলাইন পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করল। আসুন পাঠক পৃষ্ঠাদের প্রেমের গোপন কথা অ্যান কারসনের কাছে জেনে নেই।
কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক।
দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকের ঔপন্যাসিক লঙ্গুস তার ড্যাফনিস ও ক্লোয়ি উপন্যাসের ভূমিকাতেই এমন এক ত্রিমুখী টানাপোড়েনের কথা বলেন, যা উপন্যাসটির গঠন ও অস্তিত্বের মূল কারণ। তিনি জানান, একদিন তিনি প্রেমদেবতা ইরোসের কাহিনি আঁকা একটি ছবি দেখেছিলেন। সেটি ছিল তার দেখা সবচেয়ে সুন্দর জিনিস। চারপাশের বনভূমি, জলধারা, প্রকৃতির সমস্ত সৌন্দর্যকেও যেন ছাড়িয়ে গিয়েছিল ছবিটি। সেই সৌন্দর্য তাকে এমন এক আকাঙ্ক্ষায় আচ্ছন্ন করল, যার নাম পোথোস—দূরের কিছুর জন্য ব্যাকুল আকুলতা, যা নিজের কাছে নেই, অথচ যাকে কাছে পাওয়ার জন্য মন ছুটে যায়। তিনি চাইলেন, লেখার মধ্য দিয়ে সেই ছবির একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ছবি সৃষ্টি করতে। এভাবেই জন্ম নিল উপন্যাসটি।
এই সূচনার মধ্যে তিনটি উপাদান আছে।
প্রথমত, ইরোসের আঁকা ছবিটি—আদর্শ সৌন্দর্যের এমন এক প্রতিমূর্তি, যার সামনে প্রকৃতির বাস্তব সৌন্দর্যও যেন ম্লান। দ্বিতীয়ত, লঙ্গুসের উপন্যাস—শব্দ দিয়ে তৈরি আরেকটি ছবি, যা সেই প্রথম ছবির সৌন্দর্যের সমকক্ষ হতে চায়, অথবা অন্তত তার কাছাকাছি পৌঁছাতে চায়। আর এই দুই ছবির মাঝখানে রয়েছে আকাঙ্ক্ষা, পোথোস—যে শক্তি লঙ্গুসকে তাড়িত করে, কল্পনার পর্দায় দুটি ভিন্ন জগতের ছবিকে পাশাপাশি এনে দাঁড় করাতে। এই দুটি ছবি যেন একটি রূপকের দুই অংশ। একটি ছবি বা অর্থ আগে থেকেই আছে; অন্যটি নতুন করে কল্পনায় তৈরি। কল্পনার কাজ তাদের পরস্পরের কাছে নিয়ে আসে। তারা একসঙ্গে মিলে একটি অর্থ সৃষ্টি করে। রূপকের জন্মও এভাবেই। পরিচিত ও উপস্থিত কোনো কিছুর কাছ থেকে মন হাত বাড়ায় অপরিচিত, অনুপস্থিত, কাঙ্ক্ষিত অন্য কিছুর দিকে। লঙ্গুসের কল্পনাও তেমন। তাঁর লেখার এই প্রচেষ্টা, কিংবা রূপকের মাধ্যমে ভাষার নতুন অর্থ সৃষ্টি—দুটিই একধরনের প্রেমের কাজ। এখানে মন যা জানে, যা তার সামনে আছে, তার সীমা অতিক্রম করে এমন কিছুর দিকে এগিয়ে যায়, যা আলাদা, যা এখনও অধরা, যা সে চায়। এইভাবে জন্ম নেওয়া অর্থ স্থির নয়। তা ক্রমাগত চলমান, প্রাণময়। ড্যাফনিস ও ক্লোয়ি উপন্যাসে একের পর এক ত্রিভুজের মধ্যে কাহিনি যখন এক স্তর থেকে অন্য স্তরে সরে যায়, অর্থও তখন বদলায়, নতুন জীবন পায়। এই স্থানান্তরের মধ্যে একটি স্ববিরোধিতা আছে। পাঠক হিসেবে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় সেই স্ববিরোধিতার অভিজ্ঞতায় প্রবেশ করতে। আমরা দাঁড়িয়ে থাকি অন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষার কিনারায়—মুগ্ধ, থমকে যাওয়া, প্রলুব্ধ, একের পর এক ত্রিভুজে জড়িয়ে পড়া। কাগজের ওপর কয়েকটি চিহ্ন আমাদের এমনভাবে বদলে দেয়, যা আমরা আগে থেকে জানতাম না।
মন্তেন লিখেছিলেন, ‘আমার পৃষ্ঠা প্রেম করে, আর প্রেমকে অনুভব দিয়ে বোঝে।’

লঙ্গুসের পৃষ্ঠা প্রথমেই পাঠকের সঙ্গে প্রেম করে গল্পের প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধুর অথচ বিষণ্ন আবেগের মধ্যে তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে। কিন্তু এটি কেবল উপরিতলের ঘটনা। পাঠককে অন্যের প্রেমের গোপন দৃশ্য দেখার সুযোগ করে দেওয়াই এর একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। আরও গভীরে, আরও বিস্ময়কর এক প্রেমের কাজ চলছে—একটি ছবির বিপরীতে আরেকটি ছবি দাঁড় করানোর, দুটি ভিন্ন জগতকে রূপকের মধ্য দিয়ে পরস্পরের কাছে নিয়ে আসার সেই সমগ্র প্রয়াসে। ড্যাফনিস ও ক্লোয়ি এমন এক কিশোর-কিশোরীর গল্প, যারা প্রেম আবিষ্কার করছে। তাদের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা যেন কোনো প্রতীকের ইঙ্গিত। সব প্রেমিকই বিশ্বাস করে, প্রেম যেন তার নিজেরই আবিষ্কার। কিন্তু ড্যাফনিস ও ক্লোয়ি সত্যিই প্রেম আবিষ্কার করে। তারা বাস করে এক স্বপ্নময় গ্রামীণ জগতে। বসন্তের কুঁড়ি ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যেও আকাঙ্ক্ষা ফুলে ওঠে। নানা বাধা ও নিরাশা পেরিয়ে উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠাগুলোতে তারা ইরোসের গুহায় পরস্পরকে বিয়ে করে। এক সমালোচকের ভাষায়, তারা যেন প্রতীকের জগতে বাস করা দুই নিষ্পাপ মানুষ; প্রতীকী পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে প্রেমের জ্ঞানেও তাদের প্রতীকী বিকাশ ঘটে।
একটি আপেলের গল্প ধরা যাক।
ড্যাফনিস যখন বাবার কাছ থেকে ক্লোয়িকে বিয়ে করার সম্মতি পায়, আনন্দে ছুটে গিয়ে খবরটি জানাতে চায় তাকে। দুজনের দেখা হয় ফলভারে নুয়ে থাকা গাছপালায় ঘেরা একটি বাগানে। সেখানে একটি আপেলগাছের সব ফল ইতিমধ্যে পেড়ে নেওয়া হয়েছে। গাছে কোনো ফল নেই, পাতাও নেই। সমস্ত ডালপালা নগ্ন, শূন্য। অথচ গাছটির সবচেয়ে উঁচু ডালেরও একেবারে মাথায় ঝুলে আছে একটি মাত্র আপেল—বড়, সুন্দর, আর তার সুগন্ধে যেন অনেক আপেলকে হার মানায়। যে ফল পাড়ছিল, সে হয়তো এত উঁচুতে উঠতে ভয় পেয়েছিল, কিংবা আপেলটি তার চোখেই পড়েনি। অথবা এমনও হতে পারে, সুন্দর আপেলটি নিজেকে তুলে রেখেছিল কোনো প্রেমে-পড়া রাখালের জন্য। ড্যাফনিসের ইচ্ছা হলো, সে আপেলটি পাড়বে। ক্লোয়ি তাকে নিষেধ করল। কিন্তু ড্যাফনিস আপেলটি পেড়েই ফেলল। ক্লোয়ির রাগ কমাতে সে বলল— ‘হে তরুণী, সুন্দর ঋতুগুলো এই আপেলের জন্ম দিয়েছে। একটি সুন্দর গাছ তাকে লালন করেছে পাকা রোদের মধ্যে, আর ভাগ্য তাকে আগলে রেখেছে। চোখ থাকতে আমি কী করে তাকে এভাবে ফেলে রাখি? সে হয়তো মাটিতে পড়ে যেত, চরে বেড়ানো পশুর পায়ের নিচে পিষ্ট হতো, কোনো বিষাক্ত সরীসৃপের সংস্পর্শে নষ্ট হয়ে যেত, কিংবা সময় তাকে ক্ষয় করে দিত—সেখানে পড়ে থেকে, মানুষের চোখে পড়ে, প্রশংসা পেতে পেতে। সৌন্দর্যের পুরস্কার হিসেবে আফ্রোদিতি যে আপেল পেয়েছিলেন, এ সেই আপেল। আর বিজয়ের পুরস্কার হিসেবে আমি তোমাকে এটি দিচ্ছি।’ ড্যাফনিস আপেলটি ক্লোয়ির কোলে রাখল। ক্লোয়ি তাকে চুমু খেল। এত উঁচুতে ওঠার সাহস দেখিয়ে ড্যাফনিস যে একটুও অনুতপ্ত হলো না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ড্যাফনিস এমন এক প্রেমিক, যে সাহিত্যের রূপককে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে। প্রেম নিবেদনের প্রতীক দিয়েই সে প্রেম নিবেদন করে। আকাঙ্ক্ষার যে চিরন্তন গতি—অধরা কিছুর দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়া—সে যেন নিজের শরীর দিয়ে তারই অভিনয় করে। লঙ্গুস আশা করেন, পাঠক চিনতে পারবেন এই আপেলকে। এর ইঙ্গিত রয়েছে প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর একটি কবিতায়—সেখানে গাছের সর্বোচ্চ ডালে একটি আপেল রয়ে গেছে, কারণ ফল পাড়ার মানুষ সেটি পাড়তে পারেনি। লঙ্গুসের বর্ণনায় আপেলটি তাই শুধু একটি ফল নয়; এটি একটি সাহিত্যিক প্রতীক। কিন্তু আপেলের অর্থ এখানেই শেষ হয় না। গ্রিক কবিতা ও চিত্রকলায় প্রেমিকের কাছ থেকে প্রেমিকার কাছে আপেল উপহার দেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। আপেল প্রেম নিবেদনের পরিচিত উপকরণ। আফ্রোদিতি ও প্যারিসের বিচারের সঙ্গে আপেলের সম্পর্কও এখানে মনে পড়ে—সৌন্দর্য, নির্বাচন ও আকাঙ্ক্ষার সেই পুরোনো কাহিনি। ড্যাফনিস নিজেও কথার মধ্যে আফ্রোদিতিকে ডেকে এনে এই প্রতীকী অর্থটি জাগিয়ে তোলে।
আবার আপেলটিকে ক্লোয়ির প্রতীক হিসেবেও পড়া যায়—বুনো প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা এক কিশোরী, যে শিগগিরই বিয়ের মধ্য দিয়ে নতুন জীবনে প্রবেশ করবে। প্রেমিক ও প্রেমিকার আচরণও যেন চেনা ছকের অনুসরণ করে: অদম্য আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি অনমনীয় প্রতিরোধ। ড্যাফনিস জেদ ধরে, ক্লোয়ি শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে, আর আপেলটি হারায়—অর্থাৎ প্রেমের উপহার হয়ে নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে যায়। এই সমস্ত অর্থের স্তর ভেসে থাকে একটি সরল কাহিনির ওপর। সেখানে একটি সত্যিকারের আপেল আছে, একটি সত্যিকারের চুমুও আছে—অন্তত আমরা তাই পড়ি।লঙ্গুসের উপন্যাস এমনই বহুস্তরীয় অর্থের এক অবিচ্ছিন্ন বুনন। কাহিনির বাস্তব ঘটনাগুলোর ওপর স্তরগুলো স্বচ্ছ অথচ ঘনভাবে ভেসে থাকে, ঠিক যেমন গাছের ডালে ভেসে থাকার মতো করে ঝুলে থাকে আপেলটি।
এবার আপেলটির দিকে একটু ভালো করে তাকানো যাক।
আপেলটি গাছে ঝুলে থাকার কথা বলতে গিয়ে লঙ্গুস একটি অদ্ভুত ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন—এপেতেতো। শব্দটি এসেছে পেতোমাই থেকে, যার অর্থ উড়ে যাওয়া। সাধারণত ডানাওয়ালা প্রাণীর উড়ে চলা বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কখনো কখনো হৃদয়ের ভেতর দিয়ে হঠাৎ উড়ে যাওয়া আবেগ বোঝাতেও। বিশেষ করে প্রেমের আবেগের সঙ্গে শব্দটির ঘনিষ্ঠতা আছে। স্যাফো তার একটি কবিতায় এই ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে বলেছেন, ইরোস তার বুকের হৃদয়কে ডানা পরিয়ে দেয়, কিংবা তার হৃদয়কে উড়িয়ে নিয়ে যায়। লঙ্গুস কিন্তু ক্রিয়াপদটি ব্যবহার করেছেন অসমাপিকা অতীতকালের এমন এক রূপে, যা কাজটির চলমানতা ধরে রাখে। ফলে আপেলটি যেন উড়ছে, অথচ একই সঙ্গে স্থির হয়ে আছে। জেনোর সেই বিখ্যাত স্ববিরোধিতার কথা মনে পড়ে, যেখানে উড়ে চলা তিরকে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে স্থির অবস্থায় দেখা যায়। এখানে আপেলের গতিও তেমন—তার উড়ে চলা যেন সময়ের মধ্যে আটকে গেছে। আর যে বাক্যে আপেলটির উড়ে থাকার কথা বলা হয়েছে, সেটিও আগের বাক্যগুলোর সঙ্গে এক অদ্ভুত সম্পর্কে যুক্ত। সম্পর্কটি সমান্তরাল, কারণ দুটি বাক্যকে জুড়ে দিয়েছে শুধু একটি শব্দ—‘এবং’। আবার সম্পর্কটি স্ববিরোধীও। আগের তিনটি বাক্যে আমরা জেনেছি, গাছটি থেকে সব ফল পেড়ে নেওয়া হয়েছে, কোনো ফল বা পাতা অবশিষ্ট নেই, প্রতিটি ডালপালা শূন্য। তার পরেই বলা হচ্ছে, ‘এবং একটি আপেল ভেসে ছিল।’
কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই—এ কথার পরেই বলা হচ্ছে, একটি কিছু অবশিষ্ট আছে।

লঙ্গুসের অনুবাদকেরা সাধারণত তার ‘এবং’ শব্দটিকে বদলে ‘কিন্তু’ করে দেন। তাতে আপেলটি যেন হঠাৎ করে ব্যতিক্রমের বেশে আমাদের চোখের সামনে এসে পড়ে। কিন্তু লঙ্গুসের উদ্দেশ্য এত সহজ নয়। তার ব্যাকরণ আমাদের নিশ্চিন্ত দৃষ্টিকে মাঝখান থেকে দ্বিখণ্ডিত করে। একদিকে আমরা দেখি, ফলশূন্য একটি গাছ। অন্যদিকে দেখি, একটি আপেল ভেসে আছে। আর এই দুই দৃশ্যের মধ্যে যে ‘এবং’, সেটিই তৈরি করে স্ববিরোধিতার জায়গা। লঙ্গুসের ‘এবং’ আমাদের এমন এক অন্ধ বিন্দুতে দাঁড় করায়, যেখান থেকে আমরা আক্ষরিকভাবে যা উপস্থিত, তার চেয়েও বেশি কিছু দেখতে পাই।লঙ্গুস তার পাঠকের কাছে অনেক কিছু প্রত্যাশা করেন। ড্যাফনিস ও ক্লোয়ি পড়তে গিয়ে আমরা যে বিশেষ জ্ঞানের অবস্থানে পৌঁছাই, তা শুধু এই বিশ্বাস থেকে আসে না যে শেষ পর্যন্ত প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন ঘটবেই। লঙ্গুস ধরে নেন, তার পাঠক প্রেম ও কামনার সাহিত্যিক প্রতীকের দীর্ঘ ইতিহাস জানেন, রূপকের ইঙ্গিত ধরতে পারেন, ব্যাকরণের সূক্ষ্মতা বুঝতে পারেন। তিনি এই জ্ঞানকে কেবল কাজে লাগাতে চান না; তিনি চান, পাঠক যেন এর মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বাস করেন মনুষ্যচেতনার এমন এক বিশেষ কাজ আছে, যা প্রেমের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তার নাম রূপক।
ভেবে দেখুন, উপন্যাসটি পড়তে পড়তে আপনার কেমন লাগে। কখনো আপনি থাকেন চরিত্র, ঘটনা ও ইঙ্গিতের জগতে। কখনো সেখান থেকে সরে গিয়ে প্রবেশ করেন ধারণা, ব্যাখ্যা ও অর্থ উদ্ধারের জগতে। এই যাতায়াত আনন্দের, কিন্তু তার মধ্যে ব্যথাও আছে। প্রতিবার এক স্তর থেকে অন্য স্তরে যাওয়ার সময় মনে হয়, কিছু একটা হারিয়ে যাচ্ছে—অথবা হয়তো তা আগেই হারিয়ে গেছে। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমরা কাহিনির মধ্যে সম্পূর্ণ ডুবে থাকার আনন্দকে নষ্ট করি। আবার কাহিনিও আমাদের বারবার ব্যাখ্যা থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। একদিকে আমরা চাই গল্পের মধ্যে হারিয়ে যেতে, অন্যদিকে চাই তার প্রতিটি ইঙ্গিতের অর্থ উদ্ধার করতে। মন কোনোটিই ছেড়ে দিতে পারে না। ফলে আমরা দুই স্তরের মাঝখানে আটকে থাকি—একসঙ্গে দুটি দৃশ্য দেখার মতো এক অদ্ভুত অবস্থানে।
দুটি স্তর মিলে একটি অর্থ তৈরি করে।
এই দ্বৈত দৃষ্টির অভিজ্ঞতা যিনি নির্মাণ করেন, সেই ঔপন্যাসিক আসলে প্রেম করছেন। আর পাঠক হলেন তার প্রেমের লক্ষ্য—যাকে তিনি নিজের কল্পনার কাছে টানছেন, যার মনকে প্রলুব্ধ করছেন, যাকে এক অর্থ থেকে অন্য অর্থে, এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে নিয়ে যাচ্ছেন। দান্তের ‘ইনফার্নো’য় নরকবাসী ফ্রানচেস্কা যেন সেই গোপন কথাটিই বলে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘বইটি আর তার লেখক ছিল আমাদের দালাল!’ প্রেমের গল্প পড়তে গিয়ে আমরা প্রায়ই ভাবি, আমরা অন্য দুজন মানুষের প্রেম দেখছি। কিন্তু গল্পটি যখন আমাদের নিজের অনুভূতি ও চিন্তার মধ্যে প্রবেশ করে, তখন বোঝা যায়, আমরা শুধু দর্শক নই। লেখাটিও আমাদের সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করছে। আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তুলছে, আমাদের দৃষ্টিকে বিভক্ত করছে, আমাদের এক অর্থ থেকে অন্য অর্থের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
পৃষ্ঠা তখন আর কেবল কাগজের ওপর লেখা কিছু শব্দ নয়। পৃষ্ঠা প্রেম করে। আর সেই প্রেমের অর্থ সে বোঝে অনুভবের মধ্য দিয়ে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









