বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা তামাক চাষ এখন স্থানীয় কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে তামাকের চাষ হওয়ায় দৃষ্টি যত দূর যায়—শুধু তামাক আর তামাক। এতে বোরো ও রবি মৌসুমের বৈচিত্র্যময় ফসল প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
মাতামুহুরী নদীর পলিবাহিত উর্বর জমি একসময় সোনালি ধান, সরিষা, আলু, বেগুন, টমেটো, মরিচ, শিম, বাদাম, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা-হলুদসহ নানা ফসলে ভরে উঠত। স্থানীয় কৃষকেরা নিজেদের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় তরিতরকারি সরবরাহ করতেন। এখন সেই জমিগুলো একফসলি তামাকের চক্রে বন্দী।
আলীকদমের বৃদ্ধ কৃষক সৈয়দ হোসেন বলেন, “একসময় এই উপজেলার কৃষি জমি ও মাতামুহুরী নদীর চরাঞ্চলে নানান জাতের সবজি চাষ হতো। এখন যেদিকে তাকাই, শুধু তামাক।”
কৃষিবিদদের মতে, তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার হয়, যা মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং উপকারী অণুজীব ধ্বংস করে। দীর্ঘমেয়াদে জমি অনুর্বর হয়ে পড়ে, ফলে পরবর্তী মৌসুমে অন্য ফসলের উৎপাদন কমে যায়। তামাক প্রক্রিয়াজাতে জ্বালানি কাঠের ব্যাপক ব্যবহার স্থানীয় বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।
এ ছাড়া তামাক গাছ মাটির পুষ্টি উপাদান দ্রুত শোষণ করে নেয়, ফলে জমিতে ফসলের বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে কৃষিব্যবস্থা একমুখী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তামাক কোম্পানিগুলো চুক্তিভিত্তিক চাষে কৃষকদের প্রলুব্ধ করলেও বীজ, সার ও ঋণের শর্তে অনেক সময় কৃষকেরা ঋণচক্রে আটকে পড়েন। প্রকৃত উৎপাদন খরচ ও পরিবেশগত ক্ষতির হিসাব বিবেচনায় নিলে তামাক চাষ দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক নয় বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল।
উপজেলার বিভিন্ন স্থানে জাপান টোব্যাকো, ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশসহ বিভিন্ন কোম্পানির আওতায় তামাক চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে প্রকৃত চাষি ও জমির পরিমাণ নিয়ে স্বচ্ছ তথ্য পাওয়া যায় না।
তামাকের বিস্তারের ফলে স্থানীয়ভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমে গেছে। আগে যেখানে কৃষকের ঘরে ধান, ডাল, সরিষা, আলু ও মসলা মজুদ থাকত, এখন অনেক পণ্য বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। এতে খাদ্যনিরাপত্তা ও বাজারনির্ভরতা বেড়েছে।
আলীকদমের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সোহেল রানা সাংবাদিকদের জানান, সরকারিভাবে তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে মাইকিং, উঠান বৈঠক ও সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রণোদনার আওতায় কৃষকদের বিকল্প ফসলের বীজ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে বৈচিত্র্যময় কৃষিতে ফিরে আসা যায়।
স্থানীয় সচেতন লোকজন জানান, কৃষিবান্ধব ও পরিবেশ-সুরক্ষামূলক নীতিমালা বাস্তবায়ন, বিকল্প লাভজনক ফসলের বাজার নিশ্চিতকরণ এবং কৃষকদের জন্য সহজ ঋণ ও প্রণোদনা বাড়ানো ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ কঠিন। লামা ও আলীকদমের উর্বর জমিতে আবারও সোনালি ধান ও রঙিন সবজির সমারোহ ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি—নইলে একফসলি তামাকের দখলে হারিয়ে যাবে পাহাড়ের কৃষির ঐতিহ্য ও প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









