পেঁয়াজের মাঠে কৃষকের স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নের আড়ালে বাড়ছে লোকসানের শঙ্কা। বীজ, সার, কীটনাশক, জ্বালানি তেল ও শ্রমিকের মজুরির বাড়তি খরচে এবার পেঁয়াজ আবাদ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন পাবনার কৃষকেরা। গত বছরের তুলনায় বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। জমি লিজসহ কোথাও কোথাও এক বিঘা পেঁয়াজ আবাদে ব্যয় হতে পারে ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। অথচ মৌসুম শেষে উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য মিলবে কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। ফলে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদে এবার লাভের স্বপ্নের চেয়ে লোকসানের ভয়ই বেশি তাড়া করছে কৃষকদের।
পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য পরিচিত পাবনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণ। পদ্মার চরাঞ্চল ও চলনবিলের পানি নেমে যাওয়ায় অনেক কৃষক আগেভাগেই জমি প্রস্তুত করে আবাদে নেমেছেন। কোথাও কোথাও জমিতে গজাতে শুরু করেছে পেঁয়াজের চারা। তবে চাষের শুরুতেই সারসংকট ও কৃষি উপকরণের বাড়তি দাম তাঁদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পাবনা জেলায় ৮ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জমি থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩২ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। তবে আগের মৌসুমগুলোতে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় এবার অনেক কৃষক এ জাতের পেঁয়াজ আবাদ কমিয়েছেন। এতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের কোলচুরি এলাকার কৃষক ইয়াসিন আলী এবার ১০ বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণ করেছেন। জমিতে চারা গজাতে শুরু করলেও উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, গত বছর কিছু সার সরকারি নির্ধারিত দামে পেলেও এবার ডিলারের কাছ থেকে চাহিদামতো সার পাননি। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে।
ইয়াসিন আলী বলেন, প্রতি বস্তা ডিএপি সার কিনেছেন ২ হাজার ২০০ টাকায়। শ্রমিকের মজুরি ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০০ টাকা। বীজের আকার বড় হওয়ায় বিঘাপ্রতি কমপক্ষে ১৫ মণ বীজ লাগছে। সব মিলিয়ে জমি লিজসহ এবার বিঘাপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে।
তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ বেড়েছে। এত টাকা বিনিয়োগ করে পেঁয়াজ আবাদ করছি, কিন্তু বিক্রির সময় দাম পাব কি না, সেই চিন্তায় আছি। দাম না পেলে খরচ তোলাই কঠিন হয়ে যাবে।
একই এলাকার কৃষক বাকু খাঁর অভিজ্ঞতাও আশঙ্কাজনক। তিনি বলেন, আগের এক মৌসুমে কোনো কোনো কৃষক বিঘাপ্রতি এক লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনেছেন। এবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জমি চাষ ও সেচের খরচও বেড়েছে। আগে ১ হাজার ২০০ টাকায় যে সেচ দেওয়া যেত, এখন সেখানে খরচ হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। একবার পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ করাতেও দিতে হচ্ছে ৯০০ টাকা।
বাকু খাঁ বলেন, এবার পেঁয়াজের দাম মণপ্রতি অন্তত আড়াই হাজার টাকা হতে হবে। এর কম হলে উৎপাদন খরচ তুলে লাভ করা কঠিন হবে। এত টাকা খরচ করে ফসল ফলানোর পরও যদি লোকসান গুনতে হয়, তাহলে কৃষক কীভাবে টিকে থাকবে?
সুজানগর উপজেলার কামারদুলিয়া গ্রামের কৃষক আসলাম উদ্দিন জানান, গাজনার বিলের পানি নেমে যাওয়ায় জমি প্রস্তুত করেছেন। শিগগিরই মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণ শুরু করবেন। তাঁর ভাষ্য, হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজের বীজের দাম কিছুটা কমলেও বীজের আকার বড় হওয়ায় এবার বেশি পরিমাণে বীজ লাগছে। বিঘাপ্রতি ১৮ থেকে ২০ মণ পর্যন্ত বীজ প্রয়োজন হচ্ছে।
আসলাম উদ্দিন বলেন, সরকারি দামে সার পেতে ডিলারের দোকানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচ থেকে ১০ বস্তা সার প্রয়োজন হলেও অনেক সময় সারাদিন অপেক্ষা করে এক বস্তা পাওয়া যায়। পরে বাধ্য হয়ে বাইরের দোকান থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত বছর বিঘাপ্রতি ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। এবার খরচ ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা হতে পারে। বীজের দাম কিছুটা কমলেও বেশি বীজ লাগছে, আর সার-কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ বেড়েছে। সব মিলিয়ে কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা এলাকার কৃষক আব্দুল মান্নান আলী পাঁচ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করেছেন। তাঁরও অভিযোগ, সরকারি দামে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় বেশি দামে কিনতে হয়েছে। বীজের আকার বড় হওয়ায় বিঘাপ্রতি কমপক্ষে ১৩ মণ বীজ লাগছে। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিও বাড়তি খরচের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আব্দুল মান্নান আলী বলেন, এবার বিঘাপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। গত বছরের তুলনায় খরচ বেড়েছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। এখন যদি পেঁয়াজের দাম কমে যায়, তাহলে এত বিনিয়োগ করে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করেও লোকসান গুনতে হবে।
চাটমোহরের হান্ডিয়াল ইউনিয়নের কৃষক ফজর আলী ছয় বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। চলনবিলের পানি তুলনামূলক দ্রুত নেমে যাওয়ায় এবার আগেভাগে রোপণ করতে পেরেছেন তিনি। ফলন ভালো হওয়ার আশা থাকলেও সার, বীজ ও শ্রমিকের বাড়তি খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর আশঙ্কা, উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে সেই সাফল্য কৃষকের কোনো কাজে আসবে না।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) লুৎফর রহমান বলেন, চারা বা হালি পেঁয়াজ বাজারে আসার আগের সময়ের চাহিদা পূরণে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে আগের কয়েক দফায় ভালো দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক এবার এ জাতের আবাদ কমিয়েছেন। কৃষকদের আবারও আবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
সারসংকট ও উৎপাদন খরচ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জমির প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করা জরুরি। কোনো কোনো কৃষক সুপারিশের তুলনায় বেশি সার প্রয়োগ করেন। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি পেঁয়াজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, একসঙ্গে বেশি পেঁয়াজ বাজারে উঠলে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সুষম সার ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে উৎপাদন খরচ কমানো এবং ভালো মানের পেঁয়াজ উৎপাদন সম্ভব।
তবে কৃষকদের মূল প্রত্যাশা, শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়—ফসল ঘরে তোলার পর যেন ন্যায্য দামও পাওয়া যায়। তাঁদের মতে, সার ও কৃষি উপকরণের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজারদর স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ না থাকলে পেঁয়াজ চাষে লোকসানের ঝুঁকি থেকেই যাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









